ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের ছিলেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আর্টিলারীর ক্যাপ্টেন। তার জম্ম তৎকালীন নোয়াখালী জেলার রামগজ্ঞ মহাকুমার টিওরি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে পড়া অবস্থায় আফতাব কাদের পাকিস্তান আর্মিতে কমিশন র্যা্ঙ্কে পরীক্ষা দেন।

১৯৬৬ সালের ১৬ নভেম্বর আফতাব কাদের ৩৯ পিএমএ লং কোর্সে যোগ দেন। দু’বছরের ট্রেনিং শেষে আফতাবের পোষ্টিং হয় “৪০ আর্টিলারী ফিল্ড রেজিমেন্টে”। সে. লে. আফতাবের আর্মি নম্বর ছিল পিএ-১০৫৬১।খুব ভালো ইংরেজি গান গাওয়ার জন্য পাকিস্তান আর্মিতে আফতাবের নাম ছিল “রকি”।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ৫ তারিখে আফতাব দুই মাসের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। যুদ্ধ খুঁজতে খুঁজতে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ১৩ এপ্রিল ১৯৭১ মঙ্গলবার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের হাজির হন চট্টগ্রামের রামগড়ে। চট্টগ্রাম ঘিরে তখন ক্যাপ্টের রফিকুল ইসলাম ইপিআর নিয়ে এবং মেজর মীর শওকত বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে আলাদা আলাদা যুদ্ধ করছিলেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্যাপ্টেন রফিকের সাথে যোগ দিতে আসা ইপিআর বাহিনীকে মেজর জিয়াউর রহমান ২৬ ও ২৭ মার্চ থেকে চট্টগ্রামে ঢুকার মূখে কালুর ঘাটে আটকে রাখে। তখন ক্যাপ্টেন রফিক প্রাণপন যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মারফত মেজর জিয়ার কাছে খবর পাঠান জিয়া তার বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে যোগ না দিলেও যেন রফিকের অধীনস্থ ইপিআরকে ছেড়ে দেন। সেনাবাহিনী পূণ: গঠিত হবে এ যুক্তি দেখিয়ে জিয়া ইপিআরকে তার অধীনেই রাখেন। এর ফলে চিটাগাং বাঙালিদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এবং পাকিস্তানীরা চারপাশ ধীরে ধীরে দখল নিতে থাকে। কালুর ঘাটের যুদ্ধেও জিয়া অনুপুস্থিত ছিলেন।

শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের

আফতাবের রির্পোট করে মেজর জিয়ার কাছে। জিয়া ছাড়া তখন প্রত্যেক বাঙালি আর্মি অফিসারই যুদ্ধে ময়দানে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের রামগড়ে সেনা অফিসার জিয়াকে পায় এবং জিয়ার ঘোষনা সম্বদ্ধেও আফতাব জানতো। আফতাবুল কাদের জানতো না জিয়া যে তখন পর্যন্ত যুদ্ধ করে নাই এবং জিয়া যুদ্ধ না করা এবং ইপিআরকে মিথ্যা বলে আটকে রাখার কারণেই চট্টগ্রাম হাতছাড়া হয়ে গেছে। যাই হোক আফতাবুল কাদের জিয়ার অধীনে যুদ্ধে যোগ দেয়। মেজর জিয়া ২৪ এপ্রিল ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরকে রেকীতে পাঠায় আশেপাশের এলাকায়। মূলত তখন চারদিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। রামগড়ও যে কো সময় আক্রান্ত হতে পারে। জিয়া আফতাবকে দেখতে পাঠায় রামগড় থেকে যু্দ্ধ কত দূর তা দেখার জন্য। কিন্তু খারাপ গাড়ি ও খুব খারপ আবওহাওয়ার কারণে আফতাব রামগড়ে ফিরে এলে জিয়া আফতাবের সাথে খুব খারাপ ব্যাবহার করে। আফতাব এটাকে প্রফেশনাল বিষয় হিসাবেই নেন।

পর দিন আফতাব আবার রেকিতে যান। রেকিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন ৮ বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করে যাচ্ছে। সিনিয়রিটির ভিত্তিতে ৮ বেঙ্গলের সিও বা কমান্ডার মেজর জিয়া। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে অবস্থা ভিন্ন। যুদ্ধ চলছে মেজর মীর শওকতের কমান্ডে। মেজর শওকতই সিও। এছাড়াও রামগড় থাকাকালীন মেজর জিয়ার মূখে এখানকার যুদ্ধের কথা আফতাবুল কাদের শুনে নাই । মেজর জিয়া সম্ভবত এখানকার যুদ্ধের কথা জানে না । জানলে তো রমগড়ে অলস বসে থাকতো না। ক্যাপ্টেন আফতাব মহারছড়িতে পজিশন নিয়েছে। ২৭ এপ্রিল ১৯৭১। সকাল ১০ টা। তুমুল যুদ্ধ চলছে। মুক্তিবাহিনীর কাছে ভারী অস্ত্র বলতে লাইট মেশিন গান। তাও খুব কম। অন্য দিকে আর্মি, এয়ার ফোর্স, নেভী জাহাজ পিএনএস জাহাঙ্গীর এক সাথে মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমন করছিল। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী পিছু হটার চেষ্টা করে। কিন্তু এক সাথে তা প্রায় অসম্ভব। এক ধরনের ঘেরাওর মধ্যে পড়ে গেছে তারা।

ক্যাপ্টেন আফতাব মুহূর্তেই সিধান্ত নিয়ে নেয়। তিনি সবাইকে কাভার দেওয়ার সিধান্ত নেন। এই ফাঁকে অন্যরা বেরিয়ে যাবে। তিনিও আস্তে আস্তে এখান থেকে কেটে পড়বেন। আফতাব একাই এলএমজি থেকে ফায়ার করতে থাকেন। প্রথম ব্রাশ ফায়ারেই ১৫ থেকে ২০ পাকি নরকগামী হয়। অসম লড়াই। কিন্তু আফতাব ম্যাসাকার করতে থাকে। হায়েনার লাশের পর লাশ। আহত হায়েনার চিৎকার ।এই ফাঁকে মুক্তিবাহিনী ঘেরাও থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরর এল.এম.জির গুলি শেষ হলে আফতাব পড়ে থাকা আরেকটি এল.এম.জি টেনে নিয়ে ফায়ার করতে থাকেন। এই পর্যায়ে আফতাব গুলি খান। গুলি বিদ্ধ অবস্থায়ও আফতাব ফায়ার করতে থাকেন। এবং শহীদ হন। আফতাবের আত্নত্যাগের জন্য সে দিন প্রায় ১২০ জন এর বেশি মুক্তিবাহিনী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। আফতাবের মৃত দেহ বহু কষ্টে মুক্তিবাহিনী উদ্ধার করে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ে কবর দেয়। আফতাবকে কবর দেওয়ার সময় মানুষতো মানুষ রামগড়ের গাছপালা, পাহাড় পর্যন্ত কেঁদে ছিল। আফতাবের মৃত্যুর পর যুদ্ধ রামগড়ের দিকে আসতে থাকে।

আক্ষেপের বিষয় এ বীর যোদ্ধার জানাযা ও কবরের সময় কোন আর্মি অফিসার উপস্থিত ছিলেন না। অন্যান্য অফিসারেরা থাকতে পারেন নাই বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্য। একমাত্র অফিসার জিয়া তখন রামগড় থেকে আস্তে আস্তে ইন্ডিয়ার বর্ডার শহর সাব্রুমে আস্তানা গাড়ছিল রামগড় আক্রান্ত হতে পারে ভেবে। সাব্রুমে মেজর জিয়াকে জানাযার খবর দিয়ে আসতে বলা হলেও জিয়া আসছে বলে আসে নাই এয়ার এট্যাকের ভয়ে। কারণ জানাযা হবে খোলা মাঠে। যদিও তখন পর্যন্ত পাকিস্তানীরা রামগড় পর্যন্ত এসে পৌঁছাতে পারে নাই। শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবের জানাযা লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়ে ছিল।

আফতাব পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। ফেব্রুয়ারী ৫ তারিখে আফতাব দেশে আসেন। বিয়ে করেন ফেব্রুয়ারী ১৯ তারিখে চট্টগ্রামের একটি কাজী অফিসে। আফতাব বিয়ে করেন তার খালাতো বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মুর্শেদা বাহার জুলিয়াকে। বিয়ে করেই আফতাব সেদিনই ঢাকায় চলে আসেন। কেউই জানলো না তাদের বিয়ের কথা। বাসরও হলো না।

যুদ্ধের পর এক সময় জুলিয়া জানতে পারেন আফতাবের শীহদ হওয়ার কথা। তার হাতে আসে শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবের রক্ত ভেজা জামা। জীবনের বাধ্যবাদকতায় জুলিয়া আবার বিয়ে করেন ১৯৭৫ সালে। তার স্বামী আমেরিকার জেভিয়ার ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যার ড. শামুসল হুদা। জুলিয়া এখন বৃদ্ধ। তার চুল পেকে গেছে। তিনি প্রতি বছর একবার করে দেশে এসে রামগড়ের নরম প্রকৃতির মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা তার প্রেমিকের কবর জিয়ারত করেন। সাথে থাকেন ড. হূদা। হয়ত আমৃত্যুই তারা প্রতি বছর একবার করে রামগড় আসবেন ত্যাগী, সমুদ্রের থেকেও বড় একজন বীর যোদ্ধার কবর জিয়ারত করতে।

ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরকে ১৯৭৪ সালের ৩১ জানুয়ারী বীর উত্তম খেতাবে ভূষীত করা হয়। আমার আক্ষেপ খোলা জায়গায় ভয়ে জানাযা পড়তে না আসা, যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে থাকা মেজর জিয়া এবং আত্নত্যাগী, ভয়ঙ্কর যোদ্ধা পুরুষ, বীর শহীদ আফতাব কাদেরকে একই পাল্লায় ফেললেন কর্ণেল ওসমানী। খেতাবধারী নির্বাচিত করার দায়িত্ব ছিল ওসমানীর উপর। ওসমানীর সহকর্মী হিসাবে নেন মেজর জিয়াকে।

আজকের অনেকের কাছে চাপাতি হাতে খুনী বীর আর ক্যাপ্টেন আফতাবরা কাপুরুষ। আমাদের মনের এই অন্ধকার কাটবে কবে। কাটাবে কে?!

জহিরুল হক বাপ্পী
ব্লগার , লেখক , এক্টিভিস্ট

Write A Comment

error: Content is protected !!