মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি, তুমি মনে করো তোমার ছেলে বাংলার মানুষের জন্য জীবন দিয়ে গেছে।
ইতি— মতিয়ুর রহমান মল্লিক, দশম শ্রেণি, নবকুমার ইনস্টিটিউট।

পিতা আজহার আলী মল্লিক।
ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনি, মতিঝিল।’

শহীদ মতিউর

আজ শহীদ মতিয়ুর রহমান মল্লিকের ৫০ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে………

মাত্র ষোল বছর বয়সের এক কিশোর। নবম শ্রেণি পাশ করে সবে দশম শ্রেণিতে উঠেছে। পুরোনো ঢাকার বকশিবাজারে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী স্কুল নবকুমার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র সে। তার নাম মতিয়ুর, পুরো নাম মতিয়ুর রহমান মল্লিক। মা-বাবার কাছে শুধু মতি।

বাবা আজহার আলী মল্লিক স্বল্প বেতনের এক ব্যাংক-কর্মচারি। বেশ টানাটানির সংসার। এমনই এক সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও মতিয়ুরের নাম আজ ইতিহাসের সোনালি পাতায় উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা। আমরা তাকে স্মরণ করি পরম ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর গৌরবের সাথে। সেদিনের সেই মতি বা মতিয়ুর রহমান আজ শহীদ মতিয়ুর নামেই সবার কাছে পরিচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে তার নাম। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে সেই সংগ্রামের এক পর্যায়ে কিশোর মতিয়ুরের সাহস ও আত্মত্যাগ চলমান আন্দোলন-সংগ্রামকে আরও বেগবান করে।

মতিয়ুরের জন্ম ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি, ঢাকায়। তার জন্মের এগারো মাস আগে ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পাকিস্তানি পুলিশ গুলি চালায়। এতে শহীদ হয়েছিলেন বেশ ক’জন ছাত্র-জনতা।

২০শে জানুয়ারি ১৯৬৯ এ, আসাদের মৃত্যুর পর সংগ্রামে আসা ছাত্ররা পকেটে ঠিকানা লিখে নিয়ে আসত। দেশের জন্য জীবন উৎস্বর্গ করা কিশোর শহীদ মতিয়ুরের বুক পকেটে পাওয়া চিরকুটে তাঁর নিখাদ দেশপ্রেমের যে বিশলাতা দেশবাসী দেখতে পায়-তা যেন দিগন্তু বিস্তৃত আকাশ এবং সাগরের বিশালতাকেও হার মানায়।

আসাদ হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা প্রদেশব্যাপী (পূর্ব পাকিস্তান) তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।২২ জানুয়ারি কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৩ তারিখ মশাল মিছিল আর ২৪ তারিখ ২টা পর্যন্ত হরতাল।

২৪ তারিখ হরতালে,সকাল থেকে ছাত্র-জনতা নেমে এলো ঢাকায়। বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ। সচিবালয়ের পাশে আবদুল গণি রোডে মন্ত্রীর বাড়িতে আক্রমণ। পুলিশের গুলিতে নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিয়ুরের সঙ্গে মকবুল,রুস্তমসহ চারজন নিহত হয়।

সর্বত্র এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে ঢাকার মানুষ বিক্ষোভে নেমে আসে রাজপথে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলল ঢাকায়। সেই আগুনে পুড়তে থাকলো দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ অফিস,এমএনএ এনএ লস্করের বাড়ি।আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষ আদালতের বিচারকের বাড়ীতে আক্রমন হলে বিচারপতি এস এ রহমান লুঙ্গি পরে প্রাণ নিয়ে পালালেন। ২০ জানুয়ারি শহীদ মিনারে আসাদের রক্ত ছুঁয়ে এদেশের ছাত্র-জনতা যে শপথ নিয়েছিল, ২৪ জানুয়ারি মতিয়ুরের রক্তে সেই সংগ্রাম বিজয়ের পূর্ণতা লাভ করে।

২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান ঘটলে বিকাল ৩টার পর সান্ধ্য আইনের সময়-সীমা ২৫, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।মানুষ তা অমান্য করে বানের স্রোতের মতো নেমে আসে রাজপথে। সান্ধ্য আইনের মধ্যে মতিয়ুরের লাশ তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলে যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল,সেদিনের ছাত্র-জনতা তা কেবল শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন,কিন্তু সেই বেদনাবিধুর বিয়োগ ব্যথায় ভারাক্রান্ত পরিবেশকে ভাষায় ব্যক্ত করার মত শব্দসম্ভার আজও খুঁজে পায় নি কেউ! সাধারন বাঙালি পরিবারের সাদামাটা সহজ সরল মহীয়সী নারী মতিয়ুরের মা সন্তানের লাশ সামনে নিয়ে সে দিনের ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বলেছিলেন,

আমার সন্তানের রক্ত যেন বৃথা না যায়।’

কিশোর শহীদ মতিউর এর গুলিবিদ্ধ লাশ

ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের কিশোর সৈনিক শহীদ মতিয়ুরের রক্ত বৃথা যায়নি। তার রক্তের ধারা বেয়েই ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তুঙ্গস্পশী হয়, আর তারই পরিণতিতে স্বৈরাচারী আইয়ূবের ক্ষমতার অবসান ঘটে। এর পরেই আসে সত্তরের নির্বাচন, নির্বাচনে বাঙালির বিজয়, ক্ষমতা হস্তান্তরে পরবর্তী স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানের নানা ছলচাতুরি, প্রতারণা এবং সবশেষে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম।

সুতরাং কিশোর শহীদ মতিয়ুর শুধু ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানেরই এক অদম্য প্রেরণাশক্তি নয় বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসেও তার আত্মদান চিরদিন অম্লান থাকবে। শহীদ মতিয়ুর কিশোর-তরুণদের কাছে সাহস আর শক্তির প্রতীক।

ঊনসত্তরের শহীদ মতিয়ুর সে দৃষ্টান্তই রেখে গেছেন আমাদের জন্য।

কৃতজ্ঞতাঃ মরহুম আজহার আলী মল্লিক (শহীদ পিতা)
শিহাব শাহীন এবং মুস্তফা মাসুদ

Write A Comment

error: Content is protected !!