১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কয়েক ঘণ্টার সফরে বাংলাদেশে এসেছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুখ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার। সেই কিসিঞ্জার যে আজ ও আগামীর ইতিহাসে মানবতার শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হবে সন্দেহাতীতভাবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে পর পর দুটি শস্য নষ্ট হয়েছিলো বন্যার কারণে, খরা হানা দিয়েছিলো সমগ্র উত্তারঞ্চলে, সর্বোপরি এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের শুন্য অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিলো একাত্তর পরবর্তী সরকার’কে। এবং হ্যাঁ, ভুঁইফোড় ধান্ধাবাজ, আমলাতন্ত্র, মজুতদার এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে বেঈমানদের দুর্নীতি ( যা আজও বর্তমান ) প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অবকাঠামোর দুর্বলতার সুযোগে নিজেদের আখের গুছিয়েছিল। যার দুর্নাম এবং দায়ভার নিতে হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে।

সর্বোপরি,সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি, খাদ্য শস্য ও ত্রান তৎপরতাকে নোংরা রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে হত্যা করেছিলো প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুধার্ত আদম সন্তান (বর্তমানে ইয়েমেনে একই অবস্থা বিরাজমান, বিশ্ব বিবেক টিনের চশমা চোখে মৌনব্রত পালন করছে)।

১৯৭৪ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ১৫ মিনিটের বৈঠকে কিসিঞ্জার উপস্থিত ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে দেড় লাখ টন গম, তুলা, ভোজ্য ও জ্বালানি তেলসহ ঋণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

কিন্তু, হেনরি কিসিঞ্জারের চরম বিরোধিতায় জরুরি আশ্বাসগুলোর একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশকে কিসিঞ্জার আখ্যায়িত করেছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ বলে, পরবর্তী কয়েক দশক ধরে যে ব্যঙ্গাত্মক অপবাদ বয়ে বেড়াতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হেনরি কিসিঞ্জারের আত্মজীবনী ‘The White House Years’ এ তার তিনজন অপছন্দের রাষ্ট্রনায়কের তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন। বাকী দু’জন হচ্ছেন চিলির নিহত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে ও কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো

আমরা জানি, ফিদেল ক্যাস্ট্রো ব্যতীত বাকী দু’জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সন্দেহাতীতভাবেই ‘মানবতার শত্রু’ কুখ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার, সিএইএ এবং আইএসআই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। শান্তিতে নোবেল জয়ী, ৯৫ বছর বয়সী এই কুখ্যাত খুনি কি বিচারের সম্মুখীন হবে কখনো?

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে পারেনি মানবতার ধ্বজাধারী আমেরিকা। একাত্তরে ‘নিক্সন-কিসিঞ্জার’ জুটি তাদের নোংরা ষড়যন্ত্র থামিয়ে দেয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় কিসিঞ্জারের খাদ্য ও বিদেশ নীতির ফলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ৩০ হাজার মানুষের দুঃখজনক মৃত্যুর বেদনা সইতে হয়েছে। ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ মানব সৃষ্ট, এবং তার আগের দৃশ্যে ছিল পরপর দুটি ফসল বন্যার আঘাতে নষ্ট হয়ে যাওয়া, উত্তরাঞ্চলে খরা এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশের ‘শুন্য অর্থনীতি ‘।

৪৪ বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া, সেই হৃদয়বিদারক বিভীষিকা তুলে ধরে আপনাদের সামনে এই ৩২ টি স্থির চিত্র আমরা প্রকাশ করছি শুধুমাত্র এ কারণে যে…………

আমাদের অতীতের বেদনাময় ইতিহাস থেকে আজ আমরাই পৃথিবীর বুকে স্বনির্ভর জাতি হিসেবে সমাদৃত হবার পথে ধাবমান। জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থেকে উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কদর্য ষড়যন্ত্র কখনোই থেমে নেই। নীল কুঠি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশে, সাথে সক্রিয় শয়তান ‘আইএসআই’ ও তাদের অমানুষ দালালের দল। দৃঢ় ঐক্যই কেবল পারে সকল বাঁধা অতিক্রম করে সফলতম রাষ্ট্র হিসেবে প্রিয় জন্মভূমিকে প্রতিষ্ঠা করতে।

কৃতজ্ঞতা : গেরিলা ৭১

Write A Comment

error: Content is protected !!