সাজেক ভ্যালির আশেপাশে একটা ক্রিকেট স্টেডিয়াম করা যেতে পারে। বিদেশী ক্রিকেট টিম নয়নাভিরাম সাজেকের রূপ উপভোগ করবে সাজেক ভ্যালির বাংলোর ব্যালকনিতে বসে। আঙ্গুল ছুঁয়ে দেখতে চাইবে আশ্চর্য মেঘদলকে…। এরকম রোমান্টিক কোন মুহূর্তে যদি কোন বেরসিক ভূমিপুত্র ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের মত সেই বিদেশী ক্রিকেট টিমের প্রতি আহ্বান জানায় এখানে না খেলতে, তখন আমাদের কতজন মানবতাবাদী সেই ভূমিপুত্রের সমর্থনে দাঁড়াবেন?

১৯৬২ সালের কাপ্তাই বাঁধ করে হাজার হাজার পাহাড়ীদের গৃহহীন করা হয়েছিলো। পাহাড়ীদের কাছে আজো যা ‘কর্ণফুলীর কান্না’ হয়ে আছে। নুন্যতম পূর্ণবাসন ছাড়াই মানুষগুলো ছিন্নমূল হয়ে গিয়েছিলো। তাদের কতেক দেশের সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে ভারত গিয়েছে, কতেক সাজেকের দুর্গম পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। সরকার বাহাদুর সেখান থেকেও অবশেষে পাহাড়ে উন্নয়ন আধুনিকতা আনয়নের লক্ষে ৬০টি খুমি আদিবাসী পরিবারকে এখান থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। তাদের জমিজমা সব কেড়ে নেয়। গড়ে উঠে প্রমোদ প্রাসাদ ‘সাজেক ভ্যালী’।

ইজরাইলের অবৈধ বসতির খবরে আমাদের রক্ত গরম হয়ে উঠে, প্রশ্ন তুলি, বিশ্বনেতাদের কি চোখ নেই? ইজরাইলী দখলদারীকে সহ্য করতে না পেরে মানববন্ধন করি। অথচ নিজ দেশের সেনাবাহিনীর দখলদারীর পক্ষে সমর্থন জানাই। পাহাড়ী আদিবাসীরা বহিরাগত, তারা স্বাধীনতা বিরোধী, সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী… তাই সেটেলমেন্ট করি বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদ। তাদের ভূমি দখলের সময় আদিবাসীর সংজ্ঞা নিয়ে অভিধান খুলে পন্ডিত সাজি।

‘সেভ গাজা’ প্রজন্মের কতজন জানে বাংলাদেশী দখলদারীর খবর? ৮টি মানবাধিকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ১৩ নভেম্বর ২০১৪ ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের তিনটি মৌজায় বনবিভাগের ১,৭৮৮ একর জমি সেনানিবাস স্থাপনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। বান্দরবানের রুমাতে সেনানিবাস স্থাপনের জন্য ৯৯৭ একর পাহাড়ীদের জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ১,৪০৮ একর কৃষিজমি সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়ার চর ক্যারিং মৌজার ১০ হাজার একর কৃষিজমি হাতিয়া, সুবর্ণচর এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত প্রায় ৩৫ হাজার একর কৃষিজমি সেনাবাহিনীকে বরাদ্দ দেয়ার হয়েছে…। ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের জন্মভূমি হারানো বেদনায় ভরা কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন আমাদের কবিরা। কিন্তু কেউ কাপ্তাই বাঁধে জন্মভূমি হারানো পাহাড়ীদের নিয়ে কবিতা লেখেননি। মধুপুরের গারোদের নিয়ে কেউ দুই লাইনের একটা কবিতা লিখল না কেন? বর্মায় যুদ্ধ করতে একটা বন্দুকের জন্য মিনতি করা আমাদের কবিটি সাজেক ভ্যালিতে একদিন একরাত্রীর কোন প্যাকেজে পাঠিয়ে দিলে দেখবেন দারুণ উপভোগ করছেন…।

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনকে জাতীয় উদ্যান করার নামে আদিবাসী গারোদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে শরণাথী বানানো হয়েছিলো। সেই জাতীয় উদ্যান আজ বৃক্ষ শূন্য বিরামভূমি। শত শত গারো আর কোচ জাতিকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছিলো সংরক্ষিত বনাঞ্চল করার নামে সেই ষাটের দশকে। তখনো আমাদের এখানে ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের কোন কমতি ছিলো না। কিন্তু গারো কোচদের উচ্ছেদ কোনভাবেই তাদের মনে দাগ কাটতে পারেনি। আপনি লঙ্গদুতের চারশো পাহাড়ীর বাড়িঘরে আগুন লাগানোর ঘটনা জানেন না বা জেনেও মটকা মেরে ঘুমের ভান করে থাকেন কিন্তু গাজায় ইজরাইলের ইহুদী বসতির খবরে ফেইসবুকে গরম হয়ে যান! ‘২০১২ সালের ২২-২৩ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটি শহরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলায় শতাধিক জুম্ম ও ৯ জন বাঙালি আহত এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যালয় ও বিশ্রামাগারে হামলাসহ জুম্মদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাত ভাঙচুর করা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১১ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলায় সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে জুম্মদের ১১০টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভস্মিভূত এবং ১৭ এপ্রিল ২০১১ রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার বগাচদর এলাকায় হামলা চালিয়ে ২১টি ঘরবাড়ি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং লুটপাট করা হয়।(সংবাদ সম্মেলন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, ১ ডিসেম্বর, ২০১৪)’ –এরকম বড় বড় ঘটনা আপনাকে ফিলিস্তিনি আবেগ এনে দিতে পারে না কারণ এরা কেউ মুসলমান নয়? এরা কেউ বাঙালী নয়?

গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের মাথার নিচে চালা নেই, কলা পাতায় খেয়ে বাঁচা এই মানুষদের জন্য রোহিঙ্গাদের মত ত্রাণ উঠেনি গোটা দেশ থেকে। গোবিন্দগঞ্জের সুগার মিলের অধিনে থাকা ১৮৪২.৩০ একর জমি যা ছিল সাঁওতালদের সম্পত্তি। সরকার বাহাদুর এখান থেকেও দেশের চিনি উৎপাদন বাড়াতে তাদের উচ্ছেদ করেছিলো। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, তিন প্রজন্মে সাঁওতালদের সাড়ে ৩ লক্ষ বিঘা জমি হাতিয়ে নেয়া হয়েছে যার অর্থমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা!

 

মেসিরা ইজরাইলে তাদের প্রস্তুতি ম্যাচ বাতিল করেছে। বহু বামাতী, প্রগতিশীল সুশীল, আমাতী, জামাতী মেসির জেরুজালেম সফরের ছবি দেখিয়ে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে গ্রুপ ছবি দেখিয়ে তাকে ‘ইহুদীবাদী’ প্রমাণ করতে চাইছিলো। অথচ এরা একেকজন মনে মনে প্যান ইসলামিজম…!

সুষুপ্ত পাঠক

Write A Comment

error: Content is protected !!