বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন আজকে। বঙ্গবন্ধু নিজে একবার কাউকে বলেছিলেন, আমার আবার জন্মদিন আর মৃত্যুদিন! এরপরও আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন মনে রাখি, মৃত্যুর দিন তো মনে রাখিই- নিতান্ত ভালোবাসার করনেই এইসব দিন আমরা পালন করি। এখন তো ফেসবুক হয়েছে, এইসব দিন এলে আমরা একটা ফেসবুক পোষ্ট মারি নিজে অনুভূতি প্রকাশ করে। আর এখন কিনা আওয়ামী লীগের সরকারও হয়েছে, সরকারিভাবেই বঙ্গবন্ধুর জন্যে এইসব দিনের কর্মসূচী পালন করা হয়।

ভালো লাগে। ভালো লাগে যে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে দেশের সব কয়টা টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ কর্মসূচী হয়, খবরের কাগজে বিশেষ সাপ্লিমেন্ট হয়। আমরা তো এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছি যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করা তো দূরের কথা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করাটাই ছিল এক ধরনের দুঃসাহসী কর্মসূচী পালন করা। ১৫ই আগস্টের একটা ছোট কর্মসূচী তো নয় যেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে একটা মিছিল করা। আর এটা তো শুধু যে সরকার বা সরকারী দলের বাধা ছিল সে তো নয়। দেশের বেশীরভাগ রাজনৈতিক দল ও কর্মীরাও বঙ্গবন্ধুর জন্ম বা মৃত্যুর দিনে তাঁকে নিয়ে কটু কথা বলতে ছাড়ত না।

এখন যেসব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা মোটামুটি একটা ‘গণতান্ত্রিক’ চেহারা ধরেছেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বা ১৫ই আগস্টে বানি টানি দিয়ে থাকেন এদের অনেকের নাম ধরেই আমি বলতে পারি- আমার বয়সী বা আমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ স্বাক্ষিও পাবেন- এরা একসময় ১৫ই আগস্টে আনন্দ করতেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে অনেকেই নাজাত দিবস পালন করতেন- আর অনানুষ্ঠানিকভাবে তো জাসদ (আজকে তো অনেক ভাগ হয়েছে, বাসদও হয়েছে), ওয়ার্কার্স পার্টি, অন্যান্য মাওবাদী অ ইসলামপন্থী দলগুলি, এরা দল বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে কি বলতেন এই সেদিনও- ৯৬এর আগে- সেকথা অনেকেরই মনে থাকার কথা।

আমি তো অনেক ছোটবেলা থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন করি। আওয়ামী লীগের সাথে ছাত্র লীগের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৫ই আগস্টে কর্মসূচী করতে গিয়ে ছাগত্র লীগ আওয়ামী লীগের কর্মীরা মার খেয়েছে বিএনপির হাতে এরকম ঘটনা দেশের বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের ওরা করতো বটে, খুবই অনানুষ্ঠানিক আর ঘরোয়াভাবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে একটু বড় কর্মসূচী করতো বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

বঙ্গবন্ধু পরিষদ সংগঠনটির সাড়াশব্দ খুব একটা পাই না আজকালল। এই সংগঠনের কর্মসূচীগুলিতে আওয়ামী লীগের দলীয় শৃঙ্খলার বাইরেও বুদ্ধিজীবীরা আসতেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের করমসুচিগুলি হতো বড় শহরে। সেমিনার বা আলোচনা সভা ধরনের। ছোট শহরে এরকম কর্মসূচী মাঝে মাঝে হতো বটে, কিন্তু সেই কর্মসূচীতে কোন টিচার লেখক সাংবাদিক বা সংস্কৃতি কর্মী বঙ্গবন্ধুর কথা আলোচনা করতে গেলে বা শুনতে গেলে তাকেও নিন্দা করা হতো।

কিন্তু এইরকম কঠিন কঠোর বৈরি পরিবেশের মধ্যেও কিছু মানুষ বঙ্গবন্ধুর কথা স্মরণ করতো সবসময়ই। স্মরণ করতো পরম ভালোবাসায়। আমি আমার চারপাশেই এমন লোকজনকে দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর প্রতি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আজেবাজে কথা যখন বলতো লোকে- মফঃস্বলের বাজারের মিষ্টির দোকানে বা চায়ের দোকানের আড্ডায় বা সেলুনের সামনে ছুটির দিনে সকাল বেলা খবরের কাগজ সামনে নিয়ে- এইসব মানুষ বোবা প্রাণীর মত বুকের ভেতর ব্যাথা পুষে রাখতেন।

এরকম দৃশ্য আমি দেখেছি। দল বেঁধে একদল লোক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বাজে কথা বলছে। নিতান্ত চাষাভুষা ধরনের সাধারণ কাপড় পড়া মুখ খোঁচা দাঁড়ি একজন মধ্যবয়স্ক লোক নীরবে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে- আমি ওর চোখে দেখেছি যন্ত্রণা কান্না, যেন কেউ ওর কলজেটা চেপে ধরেছে সাঁড়াশিতে কিন্তু সে তার যন্ত্রণা প্রকাশ করতে পারছে না।

আম মাঝে মাঝে চিন্তা করি। সেইসব লোকগুলি কি মরে গেছে যারা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তকণ্ঠে গালাগালি করতো? কিছু তো মরেছে নিশ্চয়ই কিন্তু সকলে তো মরেনি। ওরা এখন গণতন্ত্রী হয়েছে। ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুর জন্যে শোকবার্তা দেয়। ওদের একদল তো রীতিমত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে। যারা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে ওরা কি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ওদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলেছে? কি করে পারে ওরা?

না, এখন তো আওয়ামী লীগ আমাদের মিত্র নেই। নব্বইয়ের দশকে মাঝমাঝি এসে আওয়ামী লীগ তার নীতি পরিবর্তন করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের যে নীতি তাতে তো এই দলটি আর সমাজতন্ত্রী ও কম্যুনিস্টদের মিত্র হতে পারেনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গবন্ধুই। বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি দেশ গঠন করেছেন তিনি- এটা তো সকলেই জানি। কিন্তু এটা তো রাজনৈতিক সাহিত্যের কথা। তার চেয়েও বড় যেটা- বাঙালীর জন্যে তার বিশাল বুকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

আজকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। আমি বঙ্গবন্ধুর নামে রাজনীতি করি না। কিন্তু একজন বাঙালী তো আমি। এই বিশাল সুদর্শন মানুষটির চোখের জল চেখেছেন আপনারা ইউটিউবে নানান বক্তৃতায়। তার একেক ফোঁটা চোখের জল যেন বঙ্গোপসাগরের চেয়ে গভীর- নিতান্ত শুদ্ধ ভালোবাসার অশ্রু। আজ এই লোকটির জন্মদিন। আমাদের সকলের ভালোবাসা একসাথে জুড়ে দিলেও তাঁর অশ্রুর সমান গভীর হবে না।

শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধু।

ইমতিয়াজ মাহমুদ
সিনিয়র আইনজীবী

Write A Comment

error: Content is protected !!