শভিনিজমের অন্ধকারে বৃথা আলোকের সন্ধান : ইমতিয়াজ মাহমুদ

0

(১)
একটা এপিসোড গেল আরকি। আমার তো ধারনা ছিল আমার হৃদয় বেশ ভাল সুস্থ এবং চাঙ্গা, এর মধ্যে যে নলগুলিতে নানারকম তেল চর্বী ময়লা কতকিছু জমে জমে দুই একটা ধমনী যে বন্ধ হওয়ায় উপক্রম হয়েছিল সে তো টেরই পাইনি। এখন তো ডাক্তার সাহেবেরা নিজেরাই পর্দায় দেখিয়ে দিলেন, একটা ধমনী তো একদম বন্ধ হওয়ারই জোগাড়। ডাক্তাররা বললেন যে সেটা নাকি সচল আছে, কিন্তু ইমেজ দেখে আমাদের কারোই মনে হয়নি যে সেই ধমনীটা সচল আছে। মোটা ধমনীটার মাঝখানের একটা জায়গা একদম বন্ধ, মনে হচ্ছিল ঐ জায়গাটায় ধমনীটা ছিঁড়ে দুই টুকরা হয়ে গেছে।

সেই ধমনীটার যে অংশটা প্রায় ভরাট হয়ে গেছিল, ঐ জায়গাটা ডাক্তাররা ঠিক করে দিয়েছেন, আরও কিছু এইরকম প্রতিবন্ধকতা রয়েছে হৃৎপিণ্ডের চারপাশের নানান ধমনী ইত্যাদিতে, এইগুলি পর্যায়ক্রমে ঠিকঠাক করতে হবে। তার মানে ডাক্তারদের সাথে মোটামুটি একটা মাঝারী মেয়াদের হার্দিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেল। এই সম্পর্কে তো এমনিতে কোন ক্ষতি নেই, চমৎকার ব্যাপার, ডাক্তাররা যেভাবে হৃৎপিণ্ড সারাই ফারাই করেন আর ব্যাবস্থাপনা করেন সেগুলিও সেরকম জটিল মনে হলো না। একটাই অসুবিধা, এইসব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই তিন সাড়ে তিনদিনের হাসপাতালবাসে একরকম ফতুর হয়ে আগামী কিছুদিনের জন্যে। আগামী ছয় সপ্তাহ কোর্ট বন্ধ, বুঝে অবস্থা! ভাগ্যিস বেগম সাহেবা দেখছেন ব্যাপারটা।

চিকিৎসা ইত্যাদি নিয়ে বেশী কথা বলব না। চিকিৎসা হয়েছে, চলছে চলবে। যে কথাটা আপনাদেরকে বলতে বসেছি সেটা হচ্ছে এই যে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে এসেছি, আমাকে কারা বাঁচিয়ে রেখেছে জানেন? একদল অসাধারণ রূপসী যুবতী। বলতে পারেন ওরাই আমাকে ধরে রেখেছে, ঐ যে প্রবল সরিতে ভেসে যাচ্ছে এরকম ছাগলছানাকে যেভাবে কান ঠ্যাঙ যেটা পারে সেটা ধরেই আটকে রাখে চাষি বৌ সেরকম। এবং এইসব রূপসীরা কেউই শাড়ী পরে ছিলেন না।

কারা এরা? আমার প্রিয়তমা স্ত্রী এবং কন্যা ছোট ছিলেনই, আর ছিলেন এক ঝাঁক নার্স ক্লিনার বা খাবার টাবার দেয় বা এইরকম কাজে নিয়োজিত ইউনিফর্ম পরা মেয়েরা। এরা যে একেকজন কি সুন্দর দেখতে!

(২)
আমি যখন মোটামুটি সুস্থতার পথে, ডাক্তাররা ছেড়ে দিবেন যে কোন সময়, নিবিড় যত্নের ইউনিট থেকে সাধারণ কেবিনে গেছি। মোবাইল ফোন পেয়েছি, ফেসবুক খুলেছি, তখন দেখি ঐ ফাজিল প্রকৃতির লেখাটা। প্রথম আলোর ‘অন্য আলো’ পাতায়। ঐ যে, কলেজ টিচার ছিলেন একসময়, মাঝখানে বিটিভিতে ভাঁড় হিসাবেও কাজ করেছেন, শেষ পর্যন্ত আমেরিকানদের পয়সায় তরুণদের মধ্যে কমিউনিস্ট বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলতা ছড়ানোর সৃজনশীল কাজটার দায়তিও নিয়েছে ঐ ভদ্রলোকে লিখেছেন ঐটা। কি লিখেছেন? বাঙালী মেয়েরা খাটো বলে নাকি শাড়ী ছাড়া আর কোন পোশাকে বাঙালী নারীকে সুন্দর লাগে না। আর শাড়ীতে বাঙালী নারীকে কেন সুন্দর লাগে? সেটা বলতে গিয়ে তিনি যে একতা হিনমন্য এবং স্থূল বর্ণনা ফেঁদেছেন, সে কেবল একজন মেল শভিনিস্ট পিগ ভাঁড়ের সাথেই মানায়।

শোনেন, একটু বাড়তি দৈহিক উচ্চতা সকল মানুষের জন্যেই একটু বাড়তি সৌন্দর্য যোগ করে। দীর্ঘদেহী নারীদের প্রতি আমার একটু পক্ষপাতিত্ব আছে সেটাও সত্যি। কিন্তু নারীর রূপের সাথে কেবল তার দৈহিক উচ্চতা বা বুকের বা নিতম্বের গঠন এইসব ছাড়া যারা আর কোন কিছুর সংযোগ দেখেন এরা পূর্ণ মানুষ নয়। পূর্ণ মানুষ নয় মানে? মানে এদের ইন্টেলেকচুয়াল ফ্যাকাল্টি পুরোটা বিকশিত হয়নি। বিকশিত হলে ওর ঠিকই বুঝতে পারতো যে নারীর (কেবল নারীরই নয়, নারী পুরুষ সকলেরই) সৌন্দর্য কেবল শরীরের রঙ বা গঠন দিয়ে কখনোই নির্ধারিত হয় না। শুধু দৈহিক উচ্চতা তো মোটেই নয়।

এই যে নার্স ও অন্যদের কথা বললাম, আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন ইউনিফর্ম পরা নারীকে দেখলেই অপরূপা লাগে। এই যে আমাদের কোর্টে পুলিশ প্রহরা থাকে, সেখানে সবসময়ই দুই চারজন্য নারী পুলিশ থাকে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পুলিশ মেয়েগুলিকে দেখি। শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলিকে দেখতে কি যে সুন্দর লাগে! পদমর্যাদা হয়তো কিছুই না- কনস্টেবল বা এএসআই- তবুও ওদেরকে সালাম দিতে ইচ্ছে করে। শক্ত করে বাঁধা চুল, দৃঢ় চলাফেরা, মেরুদণ্ড সোজা, পায়ে বুট পরা- যে কোন গডেসের চেয়ে রূপবতী মনে হয় ওদেরকে আমার কাছে।

(৩)
আর শুধু পুলিশ বা মিলিটারি নয়, ইউনিফর্ম পরা যে পেশাতেই যাক মেয়েরা, এই যে নার্সরা- কি যে সুন্দর লাগে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমাকে যখন প্রথম সিসিইউতে নিয়ে গেল, চারপাশে গুরুতর অসুস্থ সব রোগী, ভীতিকর পরিবেশ, সেখানে একতা ছোটখাটো আকৃতির মেয়ে, পাঁচ ফুটের চেয়ে ইঞ্চি তিনেক বড় হবে কিনা সন্দেহ আছে, একতা ফাইল হাতে আমার পাশে এসে বলে, আঙ্কেল আমার নাম মনীষা, এখন থেকে আমি আপনার দেখাশুনা করবো। গাঢ় মেরুন রঙের ট্রাউজার, একই রঙের টপস পরা মেয়েটাকে কি যে মিষ্টি লাগছিল। পরিপাটি করে আটকানো চুল- কাজে কর্মে নিপুণ।

এমনিতে মনে হবে একটু এলোমেলো, কপালে আবার ছোট করে একটা লাল টিপ পরেছে, লিপস্টিক পরেছে যে সেটাও একটু বেঁকে গেছে, চোখের তাড়ায় কিশোরীসুলভ ঝিলিক এখনো যায়নি। একতা নাকফুল পরেছে সেটাও বাঁকা। এইসব কিছুর পরেও ওর অসাধারণ রূপ এমনকি যে কোন কানা মানুষেরও চোখে পড়বে। বুক ভর্তি প্রচণ্ড ব্যাথা নিয়েও আমি মনীষার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করি। ওকে জানাই, মনীষা আমার ছোট মেয়েটার নাম।

মনীষার শিফট শেষ হলে আসে একটু মারমা মেয়ে। সেও খাটো, কিন্তু মনীষার এতো শুকনো পটাস নয়। আর পাহাড়ি মেয়ে তো, ওর শক্তিও একটু বেশী আর চেহারায়ও একটা দৃঢ় ভাব আছে। এই মেয়েটার কাজের ভাবভঙ্গি কিরকম বলি।আমি তো চিতপটাং হয়ে পড়ে আছি বিছানায়। আমাকে সোজা করে বসতে হলেও বেশ কায়দা করতে হয়। প্রথমে নার্সরা হাত ধরে তুলে সোজা করে বসায়, আমি শক্ত করে হাতল ধরে বসলে তারপর বিছানার পিঠটা সোজা করা ইত্যাদি। মেম্যাচিং সোজা করে বসায় কিভাবে? ‘স্যার আপনাকে এখনো বসতে হবে’ বলে আমার আঁকটা হাত ওর কাঁধে নিয়ে আমাকে পেছন থেকে এক হাতে জড়িয়ে এক হ্যাঁচকা টানে বসিয়ে দিল। অনায়াসে। আমি কিন্তু নেহায়েত হালকা পাতলা মানুষ নই।

শুধু মনীষা বা মেম্যাচিংই নয়, অন্য নার্সরা যারা ছিল, রুমি আর sহারমিন, আর ক্লিনাররা, সহকারীরা, আর গার্ডটা- একবার চুরি করে বেরুতে চাইছিলাম বলে আমারকে তাড়া করে এনে বিছানায় ফেলেছে- প্রতিটা মেয়েকেই ওদের নিজের নিজের ইউনিফর্মে এতো সুন্দর লাগে! মুগ্ধ হয়ে থাকতে হয় শুধু।

(৪)
আমি বা আপনি আমাদের এই খর্বকায় কালাকোলা বা শ্যামলা পৃথুলা নারীদেরকে এতো সুন্দর দেখি, শাড়ীতে তো আমাদের নারীকে আমার কাছে সুন্দর লাগেই, স্কার্ট জিনস শালোয়ার কামিজ স্যুট বুট সবকিছুতেই সুন্দর লাগে। তাইলে এই যে বুড়ো ভাঁড় সাহেব, উনার কাছে কেন আমাদের নারীদেরকে সুন্দর লাগে না- শাড়ী ছাড়া অন্য পোশাকে তাঁর কাছে কেন আমাদের নারীদেরকে দেখতে ভাল লাগে না, কেন তাঁর কাছে আমাদের মেয়েদেরকে আবেদনময়ী মনে হয় না। বলছি সেটা, আপনি শুধু খেয়াল করেন বুড়ো ভদ্রলোকে শাড়ীতে নারীর রূপ বর্ণনায় কিভাবে করেছেন।

দেখেন, ভদ্রলোকের বয়স হয়ে গেছে আশির উপর। বেশী মন্দ কথা তাঁর সম্পর্কে বলতে পারছি না। কিন্তু কেউ যদি নারীর মধ্যে রূপ বলতে শুধুমাত্র রমণের উপযোগিতা খোঁজেন তাইলে তিনি কি আর দেখবেন? এই ভদ্রলোকেরও হয়েছে এই সমস্যা। এইটা তো ওর একার সমস্যা নয়, আমাদের সমাজের কোটি পুরুষের সমস্যা। নারী হচ্ছে ওদের কাছে খাওয়ার জিনিস- নারীর উপযোগিতা কেবল একটাই, ঐটা। বাকিসব ওদের কাছে বাহুল্য। এরা নারীকে নিজেদের মত পুরোপুরি মানুষ মনে করেন না। ফলে নারীর রূপ দেখতে গেলে ওদের চোখে কেবল ওইরূপটাই আসে। শোয়ার জন্যে যদি আকর্ষণীয় মনে হয় তাইলে এরা নারীকে বলেন রূপসী আর নাইলে সেই নারীর রূপ নাই।

নাইলে এরা ঠিকই দেখতেন আমাদের মারিয়া যখন একতা গোলের উল্লাসে আসমানে লাফিয়ে ওঠে ঐ ফুটবলের পোশাকেই তাঁকে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে রূপসী বালিকা মনে হয়। নারীকে মানুষ বিবচনা করলে এই লোক ঠিকই দেখতেন ক্রিকেটারের পোশাকে আমাদের জাহানারাকে কিরকম মহিমাময়ী লাগে। নারীকে মানুষ মনে করলে আড়ংএ ঢুকার মুখে যে নারী দারওয়ানটা থাকে, তাইকে দেখেও তিনি মুগ্ধ হতেন। উদাহরণ আরও দিব? কিন্তু এরা তো সেই দলের না- এরা হচ্ছে পুং, পুঙ্গব, মেল শভিনিস্ট পিগ। মুরগির রান আর নারীর রানের মধ্যে এরা পার্থক্য দেখেন খুবই কম।

ফলত নারীর শরীরের আকৃতি রঙ বুকের গঠন নিতম্বের গঠন পেটের গঠন আর পায়ের ইয়ে ছাড়া নারীর রূপ এরা আর কিসে খুঁজবেন? ওদের মগজেই তো ঐটুকুই ঠাসা। ঐ কে জিনিসই তই নানান কায়দায় বলে আসছেন অর্ধ শতাব্দী ধরে টেলিভিশনে কাগজে সর্বত্র।

(৫)
এরা নাকি আবার বলে ‘আলোকিত মানুষ চাই’! কি আর বলবো বলেন, ইচ্ছা করে দুইটা খারাপ কথা বলে গালি দিই। সেইটা তো পারবো না। অন্তত অনুরোধ করতে পারি যে জনাব, আলোর উৎসটা মাঝে মাঝে নিজের মগজের দিকেও ঘুরিয়ে দিবেন। যে পুরুষবাদী অন্ধকার মগজের মধ্যে পুষে রেখেছেন তার কিছুটা যদি দূর হয় আরকি। বেশী কিছু বললাম না।

ইমতিয়াজ মাহমুদ
ইমতিয়াজ মাহমুদ
সিনিয়র আইনজীবী

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!