সকালে ফেসবুকে একটা পোস্ট ভেসে বেড়াতে দেখলাম। পোস্টটি আমাদের জ্ঞানী-গুণী কয়েকজন কবি সাহিত্যিকের। পোস্টে তাঁরা লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার নাকি তার ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ বইতে লিখেছেন,

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে সেই সময়কার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করার জন্য ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। স্মারকলিপিতে এক নম্বরে নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষর ছিল।

আমি ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ বইটির ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান’ এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা’ অধ্যায় দুটি পড়লাম। এ দুটি অধ্যায়ে ঐ স্মারকলিপিতে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষর ছিল, এমন কোনো কথা রমেশচন্দ্র লেখেননি। আমার ভুল হতে পারে, চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, তাই আবারও পড়লাম। নাহ্, নেই। তাহলে ফেসবুকে পোস্টদাতা এই জ্ঞানী-গুণী কবি-সাহিত্যিকরা তথ্যটি কোথায় পেলেন। তারা কি রমেশচন্দ্রের বইটি পড়েছেন? না, পড়েননি। তাহলে কেন তারা এমন পোস্ট দিলেন? ইচ্ছে করেই দিলেন? নাকি গুজবে গা ভাসালেন? যে গুজব গত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চড়াচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং তাদের দোসর প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী।

আমাদের মধ্যে যাঁরা আলোকপ্রাপ্ত, যাঁদেরকে আমরা জ্ঞানী বলে মনে করি, তাঁরাও যখন এই গুজবের ফাঁদে পা দেন, তখন কেবলই মনে হয়, জাতি হিসেবে আমরা আসলেই আত্মঘাতী। শুয়র যেমন বাপের পাছায় কামড় দিয়ে নিজের দাঁতের ধার পরীক্ষা করে, আমরাও রবীন্দ্রনাথের পাছায় কামড় দিয়ে, রবীন্দ্রনাথকে ন্যাংটো করে নিজেদেরকে জ্ঞানী-গুণী হিসেবে জাহির করার প্রয়াস চালাই।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনকে বিদ্রুপ করেছেন। স্বদেশী আন্দোলনকে বিদ্রুপ করার মতো যথেষ্ট কারণ ছিল। স্বদেশীদের নৈরাজ্যকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। প্রশ্রয় দেওয়ার মতো কোনো কারণও ছিল না। সেই জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করলেও করতে পারেন।

অসম্ভব কিছু নয়। ঠিক একই কারণেই কলকাতার হিন্দু নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়। কিন্তু পূর্ব বাংলার বিক্ষুব্ধ মুসলমানদের মধ্যে একটি আন্দোলন চলতে থাকে। এই আন্দোলন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইংরেজ সরকার এই বলে তাদের আশ্বাস দিলেন যে, পূর্ববঙ্গের ঢাকা শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। মুসলমানরা এতে খুশি হলেও হিন্দুদের মনে অসন্তোষ দেখা দেয়।

কেন অসন্তোষ দেখা দেয়? পূর্ববঙ্গে কি হিন্দু ছিল না? অবশ্যই ছিল। বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তবু কেন তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল? করার কারণ ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, প্রশাসন ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এতে আরো গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখা বাহুল্য, কলকাতার হিন্দুরা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল তার কারণ সাম্প্রদায়িক হিংসা নয়। কিংবা তারা এই কারণে বিরোধিতা করেনি যে, কলকাতার চেয়ে ঢাকা উন্নত হয়ে যাবে, অতএব ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তারা বিরোধিতা করেছিল সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদের ভয়ে। তাদের মনে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ভয় ছিল। এই কারণেই তারা বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জামায়াত-শিবির ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী হিন্দুদের ঐ বিরোধিতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে প্রচার করে যে, হিন্দুরা পূর্ববঙ্গকে সহ্য করতে পারত না, মুসলমানদেরকে সহ্য করতে পারত না, পূর্ববঙ্গের উন্নতি চাইত না, এই কারণে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। কী ভয়াবহ মিথ্যাচার!

স্বকৃত নোমান
কথাসাহিত্যিক

প্রতিক্রিয়াশীদের এই অপপ্রচারে আমাদের অনেক জ্ঞানী-গুণী বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, এখনো হয়ে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতেও হয়ত হবেন। কারণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। ইতিহাসেরও যে একটা ভাষা আছে, তা বুঝে নেওয়ার মতো সময় কই? আমরা এখন বাতাস থেকে জ্ঞান কুড়াই। অন্যের মুখ থেকে শুনে জ্ঞানী হই। আমরা গুজবে গা ভাসাতে ভালোবাসি। ফেসবুকে বিভ্রান্তি ছাড়িয়ে লাইক কামাতে, কমেন্ট কামাতে, শেয়ার কামাতে ভালোবাসি।

রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করুন, কোনো সমস্যা নেই। রবীন্দ্রনাথ দেবতা নন। তিনি মাটির মানুষ। তিনি বহু উঁচু মানের শিল্প যেমন রচনা করেছেন, তেমনি নিচুমানের শিল্পও যে রচনা করেননি তা নয়। তাঁর শিল্পের সমালোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু তাঁর বিরোধিতা করার আগে, তার কাপড়টা খুলে ন্যাংটো করে দেওয়ার আগে, হে বিপ্লবী, আপনার মনে রাখা উচিত, বিরোধিতা আর সমালোচনা এক জিনিস নয়। আরো মনে রাখা দরকার, আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্র বিরোধিতা করছেন। আপনি এমন এক ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রবিরোধিতা করছেন, যে ভূখণ্ডের বিপুল মানুষ রবীন্দ্রসংগীতকে আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে মেনে নিতে চায় না। বাদ দিতে চায়। আপনার বিরোধিতা তারা লুপে নিচ্ছে। নিজেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

রবীন্দ্রনাথ যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেননি, এটা অনেক আগেই মীমাংসিত। বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি-বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলরা যেসব তথ্য উল্লেখ করে সেসব তথ্য যৌক্তিকভাবে তথ্যসূত্রসহ বহু আগেই খণ্ডন করেছেন গবেষকরা। তবু নতুন করে কেন এই বিষয়ে বাক্যালাপ? এর কারণ কি এই যে, আমরা যতই প্রগতিশীলতার চাদর গায়ে জড়াই না কেন, যতই আমরা নিজেদেরকে আধুনিক মানুষ দাবি করি না কেন, আসলে আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে একটি বীজ। সেই বীজটি হয় ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার, নয় আত্মঘাতের।

Write A Comment

error: Content is protected !!