ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন মধুর ক্যান্টিন, বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ভোলার ক্যান্টিন। ক্যান্টিনটা এখন আর নাই। পাশে গড়ে উঠেছে নতুন কয়েকটা চায়ের স্টল। তারই একটাতে বসে চা খাচ্ছিলাম আমি আর মাহবুব। মাহবুব আমার ছোটবেলার বন্ধু এবং মামাতো ভাই।

চা খেতে খেতে আজিজুল হক কলেজের ছাত্র বাঁকার গল্প হচ্ছিলো। মাহবুব বললো বাঁকার আসল নাম মুস্তাফিজুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই একটা পা একটু ছোট ছিল ওর, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতো, সেই থেকেই ওর নাম হয়ে যায় বাঁকা। খোঁড়া পা নিয়েও দুর্দান্ত ফুটবল খেলতো বাঁকা, দৌড়াতে পারতো ভীষণ জোরে।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটা দল আসে বগুড়া দখল করতে। ঝাউতলা রেলগেটের সামনে এসে তারা বাধা পায়। রেললাইনের উপর বগি ফেলে ব্যারিকেড দেয় মানুষ, প্রতিরোধ করে- একনলা দু’নলা বন্দুক দিয়ে। এই দলে বাঁকাও ছিল।

শহর দখল করতে না পেরে ফিরে যায় সৈন্যরা। কিছুদিন পর দ্বিতীয় দফা আসে তারা আরও বড় দল নিয়ে, হত্যাযজ্ঞ চালায়, মানুষ মারে, ত্রাস সৃষ্টি করে। প্রতিরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যায় ভারতে। সঙ্গে নিয়ে যায় স্টেট ব্যাঙ্কের ভল্ট থেকে সব টাকা। এই টাকার কিছুটা নষ্ট হয়, বাকিটা পৌঁছায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হাতে। এইসব ঘটনার সঙ্গে আজিজুল হক কলেজের ছাত্র বাঁকাও ছিল। ভারতে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নেয় সে।

ফিরে এসে দেখে তার বাড়ি বৃন্দাবনপাড়ার আশেপাশে ঘাঁটি গেড়েছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। রাস্তার একপাশে সি এন্ড বি রেস্ট হাউস, অন্যপাশে মহিলা কলেজ আর আজিজুল হক কলেজ। দুই কলেজেই সৈন্যদের ছাউনি। অফিসাররা থাকে রেস্ট হাউসে।

এর মধ্যে দিয়েই শহরে যাওয়ার পথ। সৈন্যরা শহরটাকে মৃত্যুপুরি বানিয়ে ফেলেছে। আশেপাশের গ্রামগুলোও রেহাই পায়নি। ফুলবাড়ি গ্রামের মানুষ মেরে করতোয়া নদীর ধারে ফেলে রেখেছিল অনেকদিন, শেয়াল কুকুরে খেয়েছে।

শহরে শুরু হয়েছে আরেক উৎপাত। অবাঙালী কসাইরা বাঙালি হত্যার মহোৎসবে যোগ দিয়েছে সৈন্যদের সাথে। বেশি শোনা যাচ্ছে নইম কসাইয়ের নাম। সে ফতে আলি বাজারের কসাইদের সরদার। খবর পাওয়া গেল নিরীহ বাঙালিদের জবাই করে সে হত্যা করছে।

কসাইয়ের বাচ্চাটাকে চিনে আসতে হবে।’ ভোলাকে বলে বাঁকা। মাঝে মাঝে ভোলার দোকানে গ্রেনেড আর স্টেনগান রেখে শহরে যায় সে। আজকেও গেল। রাস্তা এড়িয়ে ঘুর পথে গিয়ে মাংস কেনার নাম ক’রে নইমের চেহারাটা মনে গেঁথে নিল।

দিনকয়েক রেকি করে জানা গেল সঙ্গিসাথীসহ শহর থেকে দূরে ঘোড়াধাপ হাটে যায় নইম গরু কিনতে। হাটবারে দুই পথের মোড়ে অ্যামবুশ পাতলো বাঁকা তার দল নিয়ে। গরু কিনে দু’জন রাজাকারের পাহারায় বিকেলের দিকে ফিরছিল নইম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। বাঁকাদের ফাঁদে পা দেওয়া মাত্র স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে গেল দুই রাজাকার আর নইমের সঙ্গীরা। আহত হয়ে মাটিতে পড়লো নইম। গরুগুলো উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালালো।

বাঁকা দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠালো গরুগুলো ধরে আনতে। তারপর রাস্তার ধার থেকে উঠে এসে দাঁড়ালো নইমের সামনে, জিজ্ঞেস করলো, ‘বাঙালি জবাই করতে ক্যাঙ্কা ( কেমন ) লাগে রে লইম কসাই?’ নইম জবাব দেওয়ার জন্য উঠে বসতে চেষ্টা করছিল। বাঁকা তার বুকে দুটো গুলি করে বললো, ‘শুতে থাক, ওঠা লাগবার লয়।’

দুই কলেজের মাঝখানে ছোট্ট একটা গলি। আশেপাশে দু’চারটা দোকান। দিনকয়েক পরে সকালবেলা গলির মোড়ে এসে রাস্তায় উঁকি দিল বাঁকা। ইচ্ছা, রাস্তার ওপারে গিয়ে ভোলার দোকানে এক কাপ চা খাবে।

উঁকি দিতেই দেখলো বাঁ দিকে দুটো দোকান পরের দোকান থেকে সিগারেট কিনছে দুই পাকিস্তানি সৈন্য। সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলো বাঁকা। ওর লুঙ্গির ডান-বাম দুই কোঁচড়ে দুটো গ্রেনেড ছিল। ডানদিকের কোঁচড়ের ভাঁজ খুললো সে। চোখ দুটো সৈন্যদের উপর।

দুর্ভাগ্য বাঁকার। হাত ফসকে গ্রেনেডটা পড়লো মাটিতে। সৈন্যদের একজন এদিকে তাকিয়েছিল, মুহূর্তে সে সচকিত হয়ে গেল। গ্রেনেডটা তার চোখে পড়েছে। কাঁধে রাখা অস্ত্রের মুখটা ঘুরাতে যেটুকু সময়- একঝাঁক গুলি ছুটে এলো বাঁকার দিকে। তার আগেই গলিমুখ থেকে অদৃশ্য হয়েছে বাঁকা। তীর বেগে সে ছুটছে গলির শেষ মাথা লক্ষ্য করে।

সৈন্য দুটোও দৌড়ে এলো বুটে খটখট শব্দ তুলে। গলিমুখে এসে তারা বাঁকাকে দেখতে পেল শেষ মাথায়। আবার গুলি চালালো তারা, এবার একসঙ্গে। কিন্তু লাগাতে পারলো না। বাঁকা আবার অদৃশ্য হয়েছে বিদ্যুৎ গতিতে।

এভাবে ওরা বাঁকাকে তাড়া করে নিয়ে গেল করতোয়া নদী পর্যন্ত। উপায় না দেখে ঝোপঝাড় ঠেলে করতোয়ার পানিতে লাফ দিয়ে পড়লো বাঁকা। সৈন্য দুটো এসে দেখলো তোলপাড় হচ্ছে জলে। সেই জায়গাটা লক্ষ্য করে পুরো দুই মিনিট থেমে থেমে ঠাঠাঠাঠা গুলি করলো তারা।

ভাটির দিকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত দূরে পাড়ে হেলান দিয়ে নলখাগড়ার ঝোপের ভিতরে অনড়ভাবে শুয়ে শব্দটা শুনলো বাঁকা। ওর নাকটা শুধু পানির উপরে জেগে আছে। পানির নিচে বুকটা এমন ধপধপ করছে যেন ফেটে যাবে। বাম কোঁচড়ের গ্রেনেড ডান হাতে চলে এসেছে বাঁকার- ঐ শালারা এদিকে এলে এটা দিয়েই আত্মরক্ষা করতে হবে। কিন্তু গ্রেনেডটা ফাটবে কিনা কে জানে! ভিজে একদম চুবচুবা হয়ে গেছে।

ভাগ্য ভালো সৈন্য দুটো এদিকে এলো না। তাদেরও মনে ভয় আছে। ফিরে গেল তারা। অনেক অনেকক্ষণ পরে সব যখন চুপচাপ, পিছলে পানিতে নেমে গেল বাঁকা। ডুব সাঁতার দিয়ে উঠলো ওপারে। গ্রামের ভিতর দিয়ে ফিরে গেল ক্যাম্পে।

ক্যাম্পের বন্ধুরা সব শুনে সান্ত্বনা দিল ওকে- ‘বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছু আজ বাঁকা, অ্যাঁঙ্কা ( এমন ) করিস না আর।’ কিন্তু কমান্ডার অত সহজে ছাড়লো না তাকে। বকা দিলো খুব- ‘যি কাজ পারিস না, তা করবার গেছু কিসক ( কেন )? গ্রেনেডটা লস করলু মিছাই।’ বাঁকার আঁতে ঘা লাগলো বেজায়। ও ঠিক করলো বড় একটা কিছু ক’রে দেখিয়ে দেবে, সুযোগের অপেক্ষায় তক্কে তক্কে ছিল বাঁকা। কিন্তু এই ঘটনার পরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আক্রমণ করলো সৈন্যরা।

এদিকে বগুড়া দখল করার পর কলেজে ঘাঁটি গেড়ে পাকিস্তানিরা যখন আশেপাশের গ্রামে অত্যাচার এবং জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে, তখন মাহবুবের বাবা তার পুরো পরিবার নিয়ে বৃন্দাবনপাড়া ছেড়ে চলে যান দূরের এক গ্রামে। শিকারপুর আর দশটিকা পাশাপাশি দুই গ্রাম। দশটিকায় ছিল বাঁকাদের ক্যাম্প আর শিকারপুরে আশ্রয় নিয়েছিল মাহবুবরা। সেখানেই মাহবুবের মামাদের বাড়ি।

সেদিন মাহবুব তার এক মামাকে নিয়ে ঘোলাগাড়ি নামে পাশের এক গ্রামে গিয়েছিল। ওদের রেডিওটা কদিন থেকে বাজছে না ঠিকমতো। তাই মেরামত করার জন্য রেডিও-মেকানিকের খোঁজে ওরা ঘোলাগাড়ি গ্রামে গিয়েছিল। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। ফেরার পথে ওরা দেখলো দূরে শিকারপুর গ্রামে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে ওদিক থেকে। আর এগোতে পারলো না ওরা। একটা বাড়িতে আশ্রয় নিলো। সারারাত ধরে দেখলো ধোঁয়া আর আগুনের তান্ডব, শুনলো গুলির শব্দ আর মানুষের মৃত্যু-চীৎকার!

পরদিন শিকারপুর পৌঁছে জানা গেল পাকিস্তানি সৈন্যরা অনেক মানুষকে ধরে নিয়ে গেছে। তার মধ্যে মাহবুবের বাবা আর বড় মামাও আছে। দুদিন পরে তারা ফিরে এলে ঘটনা জানা গেল যে দশটিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আক্রমণ করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। ভুলে পাশের গ্রাম শিকারপুরে অপারেশন চালায় ওরা। ভুলটা বুঝতে পেরে শিকারপুরের মানুষদের ছেড়ে দিয়েছে।

ক্যাম্প থেকে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসেছিল বাঁকা। গ্রেনেডটা হারানোর পর থেকেই বড় একটা কিছু করার ইচ্ছা ছিল ওর। সুযোগটা সে বাড়ির কাছেই পেয়ে গেল। বৃন্দাবনপাড়া আর আটাপাড়ার মাঝখানে ঈদগাহের মাঠ। সেই মাঠে রাজাকার ট্রেনিং হয়। ট্রেনিং দেয় দুইজন পাঞ্জাবি। রাজাকারের সংখ্যা পনেরো জনের মতো। ভোরবেলা মাঠে একত্র হয় তারা, কিছুক্ষণ পিটি করে তাদের কমান্ডারের নেতৃত্বে, তারপর মাঠের চারপাশে দৌড়ায় রাইফেল কাঁধে।

এর মধ্যেই পাঞ্জাবি দু’জন এসে হাজির হয়। কিভাবে পজিশন নিতে হবে, কিভাবে রাইফেল পরিষ্কার করতে হবে, কিভাবে পিন খুলে গ্রেনেড ছুঁড়তে হবে এইসব শিখায়। সবশেষে সেদিনের কাজ বুঝিয়ে দেয়, ব্রিফিং করে- কোন্ গ্রাম পোড়াতে হবে, কাকে মারতে হবে, কোথা থেকে বাঙালি মেয়েদের ধরে আনতে হবে…এইসব।

তিন-চারদিন রেকি করে ওদের পুরো রুটিনটা বুঝে গেল বাঁকা। এরপর ক্যাম্প থেকে বেছে বেছে চারজন সাহসী গেরিলাকে নিয়ে এলো। গভীর রাতে সবাই মিলে মাঠের নির্দিষ্ট জায়গায় বোমা পুঁতলো, তারটা মাটি খুঁড়ে নিয়ে এলো রাস্তার এপারে বেশ কিছুটা দূরে। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলো।

সুইচটা টিপেছিল বাঁকা ঠিক ব্রিফিংয়ের সময়। পুরো মাঠটা যেন আকাশের দিকে উঠে গেল, রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যদের সবাইকে নিয়ে। কাজ শেষ, রিট্রিট করছিল বাঁকার দল, ওদের পিঠে ঝুরঝুর করে এসে পড়তে থাকলো বিস্ফোরণের ধূলাবালি আর মাটি।

…যুদ্ধ শেষ, দেশ স্বাধীন। অস্ত্রশস্ত্র তখনো জমা দেওয়া হয়নি। বৃন্দাবন পাড়ার ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলো বাঁকা। হঠাৎ দেখে দূর দিয়ে যাচ্ছে বৃন্দাবনপাড়ার রাজাকার আলতাফ। দেখেই বাঁকার মাথায় রক্ত উঠে গেল। দিলো আলতাফকে ধাওয়া।

‘ধর্ শালা রাজাকারোক!’ চিৎকার শুনেই চমকে পিছে তাকালো আলতাফ, দেখলো আজরাইল আসছে তার দিকে। প্রাণের মায়ায় সে ছুট লাগালো। রাজাকার ছুটছে, তার পিছে ছুটছে মুক্তিযোদ্ধা। ধাওয়া দিয়ে আলতাফকে রাস্তা পার করে একদম ফুলবাড়ি গ্রামের ভিতরে নিয়ে গেল বাঁকা। ছুটতে ছুটতে দিশাহারা আলতাফ বাঁকারই এক বন্ধু মোস্তার বাড়িতে ঢুকে পড়লো হুড়মুড় করে।

ভীষণ হাঁপাচ্ছে সে, সামনে পেল পানির জগ, দুই হাতে জগ ধরে ঢকঢক করে পানি খেতে লাগলো। একটু পরে দরজায় এসে দাঁড়ালো বাঁকা। সে-ও হাঁপাচ্ছে হাপরের মতো। আলতাফের পানি খাওয়ার দৃশ্যটা একমুহুর্ত দেখলো বাঁকা। বললো, জিঁউ ভরে পানি খেয়ে নে, তারপর তোর সঙ্গে হিসেব হবি।

আলতাফের পানি খাওয়া আর শেষ হয় না। পানি খাওয়া শেষ হলেই গুলি করবে বাঁকা। ভয়ে হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে ওর। একটা মোড়া টেনে নিয়ে স্টেনগানটা দু’হাঁটুর উপরে রেখে বসলো বাঁকা- ‘এদিকে ফের!’

বাঁকার দিকে ফিরলো আলতাফ।

‘নে এবার তাড়াতাড়ি কর্।‘ হুকুম দিলো বাঁকা।

কিন্তু আলতাফ আর পানি খায় না। দু’হাতে জগ মুখের কাছে ধরে কাঁপতে থাকে, এদিকে ওর লুঙ্গি ভিজে যায়। তাই দেখে খেঁকিয়ে ওঠে বাঁকা- ‘হারামজাদা এই সাহস লিয়ে তুমি রাজাকারত নাম লেখাছো!’

উঠে দুই ঘা লাগিয়ে দেয় সে রাজাকারটাকে।

গুলি করতে যাবে, এমন সময় আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন মোস্তার মা। বাঁকার হাত ধরে অনুনয় করে বললেন ,

ছেড়ে দে বাবা! মেরে কী হবে? রাজাকারের রক্তে আমার ঘর আর নষ্ট করিস না।’

একমুহুর্ত থমকালো বাঁকা। বন্ধুর মা’কে দেখলো ভালো করে। তারপর আলতাফের দিকে ফিরলো- ‘যা রে রাজাকারের বাচ্চা! বড় বাঁচা বেঁচে গেলু আজ। আর কোনোদিন হামার সামনে আসবু না। আসিছু কী তোর জীবন শ্যাষ!’

গল্প শেষ হলো। আমি আর মাহবুব বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

মুতাজিদ মমতাজ খুররাম
মুক্তিযোদ্ধা

Write A Comment

error: Content is protected !!