এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝেই আমার কাছে এসে আফসোস করে। “ইস, যদি ৭১রে থাকতে পারতাম, যদি স্টেনগানটা নিয়ে পাইক্কাগুলারে মারতে পারতাম…” ওদের জ্বলে ওঠা চোখ দেখে অবাক হই… মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি ওরা, অদ্ভুত রক্তস্রোতে ভেসে যাওয়া সেই সময়ে ওরা ছিল না, তবুও আজ ৪৪ বছর পর দেশটাকে কি পরম মমতাতেই না হৃদয়ে ধরে রেখেছে… আহারে…

আজকে এতো বছর পরেও গোলাম আজমদের ছেলেদের কথা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। কি অদ্ভুত ঔদ্ধত্যেই না ওরা ৭১রের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কি নির্লিপ্ত গলায়ই না বলে,”একাত্তরে নাকি সামান্য কিছু গণ্ডগোল হইছিল, এতদিন পর ওইসব পুরাতন ইতিহাস ঘাইটা কি লাভ?”… মাঝে মাঝে অবাক হতেও ভুলে যাই… একাত্তরে নাকি সামান্য কিছু গণ্ডগোল হইছিল… জল্লাদখানা, কল্যাণপুর, চুকনগর, মুসলিম বাজার… এগুলো নাকি সব বানানো বধ্যভূমি… অপপ্রচারমাত্র…

কয়েকবছর আগে জার্মানির ফ্রাংফুটে এক ব্রিটিশ দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিল, ট্যাক্সিড্রাইভারের সাথে ভাড়া নিয়ে বচসা হচ্ছে, ব্রিটিশ ছেলেটা হঠাৎ রেগে গিয়ে জার্মান ড্রাইভারটাকে খোঁচা দিতে হেইল হিটলার বলে একটা বিশাল স্যালুট দিয়ে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে কোথেক্কে যেন পুলিশ চলে এল, বেচারা তখনো হাত তুলে ইহুদী গণহত্যার নায়ক হিটলারকে স্যালুট দিয়ে দাড়িয়ে আছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, তিন বছর জেল হয়ে গেল তার। হলোকাস্ট আইনটা এতোটাই কঠিন জার্মানিতে, ২য় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার বিরুদ্ধে কিংবা হিটলারের পক্ষে কথা বললে জেলে যেতে হয় সেখানে, এমনকি সেটা খোঁচা হলেও। ৪৪ বছর পর পাকিস্তানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে মালাউনদের নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো হয় আর বাংলাদেশের রক্তে ভেজা জমিনে দাড়িয়ে শুয়োরশাবকেরা নির্দ্বিধায় বলে যায়, আরে মিয়া, ত্রিশ লাখ মানুষ যে মরছে, তার লিস্ট কই? তাতে অবশ্য এদের কোন জেল-জরিমানা হয় না, বরং কয়েকজনকে পাওয়া যায় “একজ্যাক্টলি ভাই, আমিও তাই বলি, পাকিস্তানিরাও তো মানুষ ছিল, তাই না” বলে সমর্থন দেবার জন্য…

একাত্তরের সেই বীভৎস এবং ইতিহাসের পৈশাচিকতম গণহত্যার ৪৪ বছরের মাথায় আজ যদি ইতিহাস বিকৃতি রোধে “জেনসাইড ডিনায়াল ল” না হয়, তাহলে ওরা ইতিহাসের মোড়টা ঘুরিয়ে দেবে। কেননা আজকের বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, স্বাধীনতাবিরোধী এখনো নানা নামে, নানা রূপে, নানা বর্ণে আশেপাশেই আছে, গণতান্ত্রিক নিয়মে কোন একদিন তাদের ক্ষমতায় চলে আসাটাও অস্বাভাবিক না। ক্ষমতায় আসার পর তারা প্রথম যে কাজটা করবে, সেটা হচ্ছে এতদিন হাল্কা চালে একাত্তরকে তারা যেভাবে গণ্ডগোল হিসেবে প্রচার করছিল, সেটাকে আইনে পরিণত করবে। ত্রিশ লাখ শহীদ হবে রূপকথার সাজানো গল্প, সম্ভ্রমহারা মা-বোনেরা হবে নির্লজ্জ মিথ্যাচারমাত্র। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সেটা হতে দেব? রক্তের দাগ কিন্তু এখনো শুকায় নাই…

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামীলীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, একমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব “হলোকাস্ট ডিনায়াল ল” এর মত একটা শক্ত আইন পার্লামেন্টে পাশ করিয়ে ওয়ান্স অ্যান্ড ফর অল এই বিতর্কের জায়গাটা ক্লোজ করে দেওয়া। আমরা আমজনতা, ক্ষুদ্র মানুষ, কিভাবে কোন আইনে এই বিতর্ক বন্ধ করা যাবে আমরা জানি না, কিন্তু আমাদের দাবিটা খুব সাধারণ একটি দাবি। বাংলাদেশে Genocide Denial Law চাই। এদেশের মাটিতে দাড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও তার ইতিহাসকে বিকৃত করে, এমন ব্যক্তি গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন হোক, সে আইনের প্রয়োগ হোক। কেউ যেনো আর কখনোই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, মুক্তিবাহিনীর কর্মকাণ্ড অথবা একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কুকীর্তি সম্পর্কে অসত্য বক্তব্য না রাখতে পারে। এমন যেকোনো কিছুকে যেনো এদেশের আইনে বিচার করা হয়…

কাজটা খুব কঠিন কিছু না, কসাই কাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো এর চেয়েও কঠিন ছিল। তারপরেও কিন্তু কাদের ফাঁসিতে ঝুলেছিল, তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল নতুন প্রজন্মের প্রচণ্ড আবেগী ছেলেমেয়েগুলোর ধনুর্ভাঙ্গা দাবীর মুখে। আমি আরেকটাবার সেই প্রচণ্ড লাভাস্রোত দেখতে চাই। একাত্তরে যুদ্ধ করতে পারোনি বলে তোমরা যারা আক্ষেপ করো, আমি সেই তরুণদের চাই। টাইম হ্যাজ কাম ফর ইউ পিপল, ৪৪ বছর পরের এই যুদ্ধটা তোমরা জিতে এনে দাও। নয় তারিখে এবং তেরো তারিখে এসে দাড়াও রাজপথে, আওয়াজ তোলো ইতিহাস বিকৃতি রোধে… ইতিহাসের এই ক্রান্তিকালে তোমাদের খুব প্রয়োজন, এই যুদ্ধটায় যে আমরা হারতে পারবো না…

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে Genocide Denial Law চাই।

লেখক একাত্তরে

Write A Comment

error: Content is protected !!