১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্যাম্পের অদূরে বসে আছে এক পাকিস্তানি স্নাইপার। হঠাৎ অশরীরী আত্মার মত ক্যাম্পের আশেপাশে কারো নড়াচড়া অনুভব করেই গুলি চালালো সে। নিঃশব্দে সেই গুলি আঘাত করলো পৃথিবীর গোপনতম এক গেরিলা সংগঠনের সদস্যের গায়ে। পাকিস্তানি স্নাইপার টের পেল না, কারণ গুলি হজম করেও টু শব্দটিও করেনি সেই গেরিলা সেনা। রেডিওর ওপারে বসে থাকা কমান্ডারকে শুধু জানিয়ে দিলো আমি আর পারছি না। কমান্ডারও নির্ভীকভাবে বাকিদের নির্দেশ দিতে শুধু দুটি শব্দ ব্যয় করলেন,

Push ahead”।

অর্ডার পেয়ে বুলগেরিয়ান একে-৪৭ আর তিব্বতিয় ছোরা হাতে নিমিষের মধ্যে পাকিস্তানিদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে একদল গেরিলা। অতর্কিত আক্রমণ করে কিছু বুঝে উঠার আগেই আবার হারিয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পকিস্তানি সেনাদের উপরে এমনই একের পর এক অতর্কিত আক্রমণ করে নাজেহাল করে দেয়া এই বাহিনীকে বলা হত ‘Phantoms of Chittagong’।

নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালি মুক্তিবাহিনীর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যোগ দেয় ভারতের ‘স্পেশাল ফ্রন্ট্রিয়ার ফোর্স’ যেটি সংক্ষেপে ‘SFF’ নেমে পরিচিত। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং’ বা ‘RAW’ এর অধীনে এরা কাজ করত। বাংলাদেশের চরম দুর্দিনে মুক্তিবাহিনীর পাশে এসে দাঁড়ায় এই স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। পার্বত্য অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাদের উপর মরণকামড় দেওয়ার এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘Operation Mountain Eagle’।

১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর ওড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী বিজু পাটনাইক প্রস্তাব দেন তিব্বত থেকে বিতাড়িত যুবকদের নিয়ে গঠন করা যেতে পারে বিশেষায়িত গেরিলা ইউনিট। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তৎকালীন প্রধান ভোলানাথ মল্লিকের কাঁধে এই বাহিনী গঠনের দায়িত্ব পড়ে। ১৯৬২ সালের ১৪ নভেম্বর তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স’, যেটি ‘Establishment 22’ নামেও পরিচিত ছিলো।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে স্পেশাল ফ্রন্ট্রিয়ার ফোর্সের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান।

অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে, তিন হাজারের অধিক স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডোকে মিজোরামের ডেমাগিরিতে নিয়ে আসা হয়। কর্ণফুলী পাড়ি দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথে মিজোরাম থেকে প্রবেশ করা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে। মূলত এভাবেই পাকিস্তানী বাহিনীকে লক্ষ্য করে ‘hit-and-run raids’ অপারেশন সাজাতে থাকে এই গেরিলারা। পাহাড়ি অঞ্চলে ঢুকে পাকিস্তানী বাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ করে আবারো ডেমাগিরিতে গা ঢাকা দিতো তারা। ফলে এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে টেরই পেতো না পাকিস্তানী হানাদারেরা। এভাবেই ভূতুড়ে আক্রমণ করে পাহাড়ি এলাকার ভূতুড়ে গেরিলা বা ‘Phantoms of Chittagong’ নামে খ্যাতি পায় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সদস্যরা।

৯ মাসের যুদ্ধে প্রায় ৯০ জন তিব্বতীয় গেরিলা প্রাণ হারিয়েছিলেন। অপারেশন মাউন্টেন ঈগলের সাথে জড়িত প্রায় ১৯০ জন আহত হয়েছিলেন যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করায় ভারত সরকার তখন স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ৫৮০ জনকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা : অমি রহমান পিয়াল এর ব্লগ

শরীফ হাসান

Write A Comment

error: Content is protected !!