পশ্চিমা বিশ্বেও নারী পুরুষের সাম্যতা খুব সহজে আসেনি (এখনও পুরো এসেছে বলা যায় না, অন্তত দৃষ্টিকটূভাবে হয়ত নেই)। দীর্ঘদিনের কুসংস্কার, টাবু অতিক্রম করা কোন সমাজেই কোনদিনই খুব সহজ নয়, পশ্চিমা সমাজও এর ব্যাতিক্রম নয়। আমেরিকাতেও যুগ কাল অতিক্রমকারী কিছু মানুষকে সমাজকে নাড়া দেওয়া কিছু নাটকীয় ঘটনা নানান সময়ে ঘটিয়ে অচলায়তনে আঘাত হানতে হয়েছে। যা কিছু সফলতা তাদের সেই নাড়া দেওয়া থেকেই এসেছে, তারই একটি ঘটনা।

 

আমেরিকার বোস্টন শহরে বোস্টন ম্যারাথন দীর্ঘদিনের একটি এলিট ম্যারাথন দৌড়ের প্রতিযোগিতা যাতে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক প্রতিযোগী অংশ নেয়, চলে আসছে সেই ১৮৯৭ সাল থেকে। মুশকিল হল ‘৭০ দশক পর্যন্ত এই প্রতিযোগীতায় মহিলাদের অংশ গ্রহণ আইনত নিষিদ্ধ ছিল। মহিলা আবার ম্যারাথন দৌড়াবে কেমন করে!

‘৬৭ সাল, ২০ বছরের ছাত্রী ক্যাথরিন সুইটজার খুব ভাল দৌড়ান, তার খুব শখ প্রেষ্টিজিয়াস বোস্টন ম্যারাথনে অংশ নেওয়া। কিন্তু শখ হলে কি হবে, আইনে তো মহিলা হয়ে উনি অংশ নিতে পারবেন না। ক্যাথরিন হয়ে উঠলেন বিদ্রোহী, যেভাবেই হোক ম্যারাথনে উনি অংশ নেবেনই। সেকেলে কাগুজে আইনকে কলা দেখাতে উনি নাম রেজিষ্টার করলেন লিঙ্গ নিরপেক্ষ কে সুইটজার, নম্বর পেলেন ২৬১।

নির্দিষ্ট দিনে দৌড় শুরু হল, কোন কোন প্রতিযোগী সাথে একজন মহিলা দৌড়ুচ্ছে দেখে অবাক হলেও তেমন গুরুত্ব দিল না, প্রথমে বেশ ভালই চলছিল। ২ মাইল সমাপ্ত হবার পর বাঁধল বিপত্তি। এক বেয়াড়া মহিলা অফিশিয়াল নম্বর লাগিয়ে দৌড়ুচ্ছে এটা ব্যাপকভাবে চাউর হয়ে গেছে। ছুটে এলেন দুজন ক্ষিপ্ত আয়োজক, তারা বেয়াড়া মহিলাকে সরিয়ে লিখিত আইন যেভাবেই হোক রক্ষা করেই ছাড়বেন। তাদের একজন জক সেম্পল, গালিগালাজ করতে করতে ক্যাথরিনকে পেছন থেকে ধাওয়া করে কাঁধে ধরে ঘুরিয়ে ফেললেন (প্রথম ছবি)। এমন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই ক্যাথরিনের বয়ফ্রেন্ড টমও ক্যাথরিনের পাশে পাশে দৌড়াচ্ছিলেন। টম এবার সাহায্যে এগিয়ে এলেন, বিশালদেহী প্রফেশনাল ফুটবলার টম জককে ধরে এক রকম ছুড়েই ফেলে দিলেন। ক্যাথরিন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও এরপর আর কোন বাধার মুখে পড়তে হয়নি। ম্যারাথনের পুরো ২৬।২ মাইল ৪ ঘণ্টা ২০ মিনিটে সমাপ্ত করে দেখিয়ে দিলেন। জকের সাথে ক্যাথরিনের সেই ধ্বস্তাধস্তির ঐতিহাসিক ছবি পরদিন শুধু আমেরিকারই নয়, পুরো বিশ্বেরই মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছিল।

এরপর ক্যাথরিন এবং আর কিছু মহিলা দৌড়বিদ শুরু করলেন আন্দোলন, আয়োজকরাও খুব সহজে ছাড়তে চায়নি। অবশেষে ‘৭২ সালে ক্যাথরিনরা সফল হলেন, বোস্টন ম্যারাথনের ওপর থেকে লিঙ্গভেদ আইনত উঠে গেল।

আমার কাছে এই উপাখ্যানের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক যেটা মনে হয়েছে সেটা এবার বলি। এই জাতীয় বহু ঘটনার ভেতর এই কারনেই এই ঘটনাকে আমার ব্যাক্তিক্রমী মনে হয়। সেই যে মারমুখী আয়োজক জক সেম্পল, ক্যাথরিনকে ‘৬৭ সালে দাঁত্মুখ খিঁচিয়ে বার করে দিতে চেয়েছিলেন তিনিই এক সময় মহিলাদের এথলেটিক্সে অংশগ্রহণের বড় সমর্থক বনে যান। আরো মজা হল ক্যাথরিনের সাথে তার গড়ে উঠে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক (২য় ছবিতে জক/ক্যাথরিন)

মুক্তমনা মানুষ বলতে সর্ব দোষত্রুটিমুক্ত মানুষ বোঝায় না, আদতে তেমন কোন আদর্শ মুক্তমনা মানুষ নেই, থাকা সম্ভব নয়। মুক্তমনা বলতে বোঝানো উচিত যিনি আদ্যিকালের কুসংস্কার থেকে বার হতে পারার মত মানসিকতা দেখাতে পারেন, শুধুমাত্র সংস্কারের কারণে গোঁয়াড়ের মত প্রাচীন মূল্যবোধ আঁকড়ে ইনিয়ে বিনিময়ে তার সাফাই গান না তাকেই। ক্যাথরিন জকের মত এমন অসংখ্য মুক্তমনা মানূষের জন্যই সভ্যতা আগায়।

শেষ ছবিতে ক্যাথরিন ৫০ বছর পর ২০১৭ সালের বোস্টন ম্যারাথনে সেই ঐতিহাসিক ২৬১ নম্বর পরে পোজ দিয়েছেন।

[এখানে বলে রাখা ভাল যে ক্যাথরিনই বোস্টন ম্যারাথন সমাপ্ত করা প্রথম মহিলা নন, তার আগেও ‘৬৬ সালে ববি গিব নামের আরেক মহিলা সেটা সফলভাবে সমাপ্ত করেছিলেন, কিন্তু তিনি অফিশিয়ালী রেজিষ্ট্রার করেননি]।

Write A Comment

error: Content is protected !!