আমার ডাক নাম ‘আবু’। গ্রামের সবাই এ নামেই ডাকত। আব্বা ছিলেন কামিল লোক। ইসলামি জলসা আর ওয়াজ করে বেড়াতেন। একেক সময় থাকতেন একেক জায়গায়। পরে সেটেল হন জামালপুরে। শৈশবটা কেটেছে অনেক কষ্টে। বয়স তখন দশ। ওই বয়সেই বাড়ির সব কাজের দায়িত্ব ছিল। দুটো গরু আর ছাগলকে ঘাস খাওয়ানো, পাট ও মরিচ খেত নিরানো, মাছ ধরা, বাজার করা আরও কত কী! সব কাজ ঠিক রেখে লেখাপড়া করতে হতো। খুব কষ্টের জীবন ছিল ওটা।

একাত্তরে ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি

বসন্ত রোগের তখন চিকিৎসা ছিল না। বাড়ি আসার পথে একবার আব্বা এ রোগে আক্রান্ত হন। আপনজনেরাও তখন এগিয়ে আসেনি। বসন্ত যে ঘরে হতো সে ঘরের লোক কারও বাড়িতে গেলে ভয়ে কেউ দরজা খুলত না। আব্বার পর আক্রান্ত হয় মা আর ছোট বোনটা। আমি তখন একা। ঘর থেকে বেরুতে পারি না। কোথাও গেলেই সবাই ধুরধুর করে। মানুষের ভয়ে বন্ধ ছিল বাজারে যাওয়াও। একমাত্র পাশের বাড়ির গফুর ভাই তখন এগিয়ে আসেন।

ঘরের পাশেই ছিল একটা বাদিগাছ। ওই গাছে উঠে বসে থাকতাম। গফুর ভাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘আবু’ বলে ডাক দিতেন। বলতেন- ‘তগো কোন বাজার লাগলে দে।’ মাঝেমধ্যে নিয়ে যেতেন দূরের অচেনা বাজার দশঘরিয়া আর ডলটাতে।

স্কুল-কলেজ তখন খুব বেশি ছিল না। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই দশগড়িয়া হাই স্কুলে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে। সাত-আটটা সাকো পাড় হয়ে যেতে হতো। বর্ষাকালে সাঁকোও যেত ডুবে। ফলে বন্ধ থাকত স্কুলে যাওয়া। আব্বা তখন জামালপুরে, দেওয়ানপাড়া গুদারাঘাট বড় মসজিদের ইমাম। চলে যাই তার কাছে। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই জামালপুর গভর্মেন্ট হাই স্কুলে।

শিক্ষকরা তখন অন্যরকম ছিল। দুর্বল ছাত্রদের বাসায় গিয়েও পড়াতেন তারা। জামালপুর গভর্মেন্ট হাই স্কুলে সবার প্রিয় ছিলেন মহিউদ্দিন স্যার, তাজুল ইসলাম স্যার ইংলিশ আর করম আলী স্যার নিতেন ম্যাথ। তাদের সহযোগিতা পেয়েছি অনেক। ফলে ম্যাট্রিকে দুইটা লেটারসহ হায়ার ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছি। পুরো ইস্ট পাকিস্তানে টুয়েলভ হয়েছিলাম। অতঃপর চলে যাই ঢাকায়, ভর্তি হই ঢাকা কলেজে। নানা কষ্টের মাঝেও লেখাপড়াটা ধরে রেখেছিলাম। কষ্টের ফল সুমিষ্ট হয়। আমার ক্ষেত্রে তা সত্যি হয়েছিল।

শৈশব ও কৈশোরের নানা স্মৃতিচারণ এভাবেই তুলে ধরেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট কর্নেল এস আই এম নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম। এক বিকেলে তাঁর বাড়িতে বসেই চলে আলাপচারিতা। নানা কথায় উঠে আসে একাত্তরের পূর্বের নানা ঘটনা প্রবাহ, যুদ্ধদিনের বীরত্বের কাহিনী এবং স্বাধীনতা লাভের পরের দেশ নিয়ে এ যোদ্ধার স্বপ্নগুলো।

নামের আগে ‘এস আই এম’ কেন?

শুরুর প্রশ্নেই উনি মুচকি হাসেন। বলেন- “পরিবারের প্রথম সন্তান হওয়ায় সকলের আদরের ছিলাম। দাদা তাই ডাকতেন ‘শামসুল ইসলাম’ বলে। কিন্তু দাদী বলতেন ‘নূরুন্নবী খান’। আব্বা দুজনকেই অনার করলেন। আকিকা দিয়ে নাম রাখলেন ‘শামসুল ইসলাম মোহাম্মদ নূরুন্নবী খান’। সংক্ষেপে এস আই এম নূরুন্নবী খান।”

তাঁর পিতার নাম হাজী হাবিবুল্লাহ খান এবং মাতা শামসুন্নাহার বেগম। বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীধরপাড়া গ্রামে। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি লক্ষ্মীধরপাড়া প্রাইমারি স্কুলে। অতঃপর প্রথমে দশগড়িয়া হাই স্কুল এবং পরে লেখাপড়া করেন জামালপুর গভমেন্ট হাই স্কুলে। ১৯৬২ সালে মেট্রিক পাশের পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। আইএসসি পাশ করেই ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের (তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) তড়িৎকৌশল বিভাগে। আর তারপর যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে সেনাবাহিনীতে কেন?- সে ইতিহাস শুনি তাঁর জবানিতে।

তাঁর ভাষায়-

“প্রথম ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফিজিক্সে। পরে বুয়েটেও টিকে গেলাম। ফলে মুরুব্বিদের কথায় একবছর ব্রেক দিয়ে ভর্তি হই বুয়েটে। কলেজে পড়েছি বোর্ড স্কলারশিপের টাকায়। এরপরই স্কলারশিপ বিষয়ভিত্তিক ভাগ হয়ে যায়। ফলে হায়ার ফাস্ট ডিভিশন পেয়েও স্কলারশিপ পেতাম মাত্র ৪০ টাকা। কিন্তু সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিষয়ে ভর্তির ফলে অনেকেই পেত ৬৫ টাকা। খরচ চালাতে মাসে আমার বিশ থেকে পঁচিশ টাকা শর্টেজ হতো। সে টাকা দেওয়া আব্বার জন্য ছিল খুবই কষ্টকর। তাই টিউশনি বা অন্য কিছু করার চিন্তা করছিলাম। ওই সময়ই বন্ধু এনাম ও নজরুল একদিন বলল, ‘চল আর্মি কমিশনড র‌্যাংকে দাঁড়াই। এখানে চারবছর পড়ে কী হবে! আর্মিতে গেলে মাত্র ছয়মাসের ট্রেনিং। ফাস্ট ওয়ার কোর্সের ব্যাচ। দেখবি এক বছরের মধ্যেই ক্যাপ্টেন হয়ে যাবি।’

রাজি হয়ে গেলাম। ফরম আনলাম বেবি আইসক্রিম, আজিমপুর থেকে। পরীক্ষা দিই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। সিলেক্টও হয়ে যাই। সিলেকশন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন স্কোয়াড্রেন লিডার। বুয়েটে পড়ছি শুনে অবাক হলেন। কেন আর্মিতে আসতে চাই? জানতে চাইলে আর্থিক সমস্যার কথাগুলো তাকে খুলে বললাম। তাড়াতাড়ি বের হতে পারলে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারব। এসব শুনে উনি খুশি হলেন। বললেন- ‘একটা স্কলারশিপ আছে- ‘আর্মি-সিভিলিয়ান স্কলারশিপ স্কিম’। এই স্কিমে গ্রাজুয়েশন লাভের পরে তোমাকে আর্মিতে চলে আসতে হবে। কমিশনড হিসেবেই জয়েন করবে তখন। সে পর্যন্ত পড়াশোনার জন্য প্রতিমাসে তোমাকে ১২০ টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া রেশন, মেডিকেলসহ সকল সুবিধাও পাবে। ইয়ারলি দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা। চাইলে এই স্কিম নিতে পার। তাহলে ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়া হবে আবার চাকুরিটাও থাকবে।’

ওই স্কলারশিপের কারণেই ১৯৬৯ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চলে যাই পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে। আট মাস চলে আর্মি ট্রেনিং। অতঃপর লেফটেন্যান্ট হিসেবে প্রথম পোস্টিং পাই কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে, ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে। আর্মি নম্বর ছিল ১২৫৮৬।”

ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে নূরুন্নবী খানের। সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে থাকেন পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামগুলোতে। বয়স এখন ছেয়াত্তর। কিন্তু সে সব আন্দোলনের নানা ঘটনাপ্রবাহ আজও তাঁর স্মৃতিপটে জীবন্ত হয়ে আছে। তাঁর ভাষায়-

“শিক্ষা আন্দোলন চলছে তখন। ওই আন্দোলনেই প্রথম মিছিলে নামি। দায়িত্ব ছিল সাউথ হোস্টেলের সবাইকে নিয়ে মিছিলে আসা। বুয়েটে গিয়েও নেতৃত্বে জড়িয়ে পড়ি। সোহরাওয়ার্দী ইঞ্জিনিয়ারিং হল (বর্তমানে-লিয়াকত ইঞ্জিনিয়ারিং হল) সংসদের জিএস নির্বাচিত হই ১৯৬৪ সালে।

সময়টা ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি। বুয়েটে তখনও ওপেনলি রাজনীতি করা যেত না। ড. রশিদ ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর। আটজন মিলে গোপনে প্রথম বুয়েটে ছাত্রলীগের কার্যক্রম শুরু করি। হারুন চৌধুরী, তোবারক, শফিউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী প্রমুখ সঙ্গে ছিলেন। শিক্ষকদের সমর্থন পাওয়ায় পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ওপেন করে দিই। ছাত্রত্ব চলে যাওয়ারও ভয় ছিল তখন। ডালুকে আহ্বায়ক করে বুয়েটে ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি গঠন করা হয় । অতঃপর ১৯৬৭ ও ১৯৬৮ সালে পরপর দুইবার বুয়েট ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি ছিলাম। বুয়েটকে আমরা ছয়দফা আন্দোলনের দুর্গ হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম। ১৯৬৯ সালে ইউকসু (প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ) এর ভিপি নির্বাচিত হই।’

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। তাঁর মুক্তির দাবিতে দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন নূরুন্নবীরা। মিটিংগুলো অধিকাংশই হতো বুয়েটের গেস্ট রুম আর কায়েদে আজম হলে। সরকারের পক্ষে তখন ছিল এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন)। এনএসএফ এক সময় ভাগ হয়ে যায়। দোলন গ্রুপ তখন চলে আসে নূরুন্নবীদের সঙ্গে। অতঃপর বুয়েটে বসেই ছাত্রনেতারা চূড়ান্ত করে এগারো দফা।

সে ইতিহাসের সাক্ষী নূরুন্নবী খান। তিনি বলেন- ‘ডাকসুর ভিপি তখন তোফায়েল আহমেদ। চারটি দল- ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফ (দোলন গ্রুপ)। সম্মিলিতভাবে এর নাম দিলাম ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। এর মুখপাত্র করা হয় ডাকসু’র ভিপি তোফায়েল আহমেদকে। উনার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব ছিল ইউকসু’র ভিপির অর্থাৎ আমার।’

তারপর কী ঘটল? তাঁর ভাষায়-

“জানুয়ারির উনিশ তারিখ। সকাল বেলা। মিছিল নিয়ে যাই শহীদ মিনারে। বকশী বাজার হয়ে আজাদ পত্রিকার সামনে আসতেই তিনদিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়ি। পরদিন পত্রিকাগুলোর শিরোণাম হয়েছিল- ‘প্রকৌশলী ছাত্ররাও পথে নেমেছে।’ বিশ তারিখ বটতলা থেকে বিশাল মিছিল বের করে ছাত্ররা। মেডিকেল কলেজের গেইটে ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় আসাদ। ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। চব্বিশ তারিখ সচিবালয়ে ঘেরাওয়ের দিনে শহীদ হয় রুস্তম ও মতিউর। ১৯৬৯ এর ছাত্র আন্দোলনে আশি পারসেন্ট ছিল বুয়েট ছাত্রদের আন্দোলন। অথচ ইতিহাসে বুয়েটের নাম তেমন প্রচার পায়নি।”

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্কলারশিপে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন। আবার ছাত্র রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন। এতে কোনো সমস্যা হয়নি?

নূরুন্নবী বলেন- “কয়েকমাস স্কলারশিপের টাকা বন্ধ ছিল। বিগ্রেডিয়ার কোরেশী ছিলেন দায়িত্বে। উনি ভাল মানুষ ছিলেন। ফলে সমস্যা তৈরি হয়নি। তবে প্রবলভাবে রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় পরবর্তীতে আর্মিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন আব্বা বললেন ‘বাবা, তুমি ওদের টাকা নিয়ে পড়াশোনা করেছো। এখন না যাওয়াটা ঠিক হবে না। এটা বেঈমানী করা হবে।”

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে নূরুন্নবী খান চলে যান পাকিস্তানের বেলুচিস্থানে, কোয়েটা স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলে ওই ট্রেনিং। ওখানে থেকেই শুনেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি।

তাঁর ভাষায়- “ভাষণের সাত-আট দিন পর মেজর মজিবুল হক চৌধুরী ঢাকা থেকে তা রেকর্ড করে আনান। শেখ মুজিবের খুব ভক্ত ছিলেন উনি। একদিন তার বাসায় বসেই শুনি ভাষণটি। বঙ্গবন্ধু বললেন- ‘আর যদি একটা গুলি চলে…….প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো…..।’ আমার কাছে ওটাই ছিল ক্লিয়ার অপারেশনাল অর্ডার।”

পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক প্রস্তুতি ও জেনারেলদের মনোভাব প্রসঙ্গে একটি অজানা ঘটনার কথা তুলে ধরেন নূরুন্নবী খান। তিনি বলেন- “কোয়েটা তখন বিভিন্ন কোর্সে প্রায় ১২-১৪শ’ আর্মি অফিসার অবস্থান করছিল। সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল মিথা খান। একদিন উনি কনফারেন্স রুমে সবাইকে ডাকলেন। বক্তৃতার এক পর্যায়ে পাকিস্তানের সর্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এক মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করা হতে পারে বলে উল্লেখ করে এর জন্য অফিসারদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। আর্মি ল্যাঙ্গুয়েজে এটাকে বলে ‘মিশন’ দেওয়া।

কথা শুনে আমি ঠিক থাকতে পারি না। দাঁড়িয়ে বলি- ‘স্যার, আমি কি জানতে পারি পাকিস্তানের কোন পার্টে এই কিলিং করার প্রয়োজন হতে পারে? প্রশ্ন শুনে জেনারেলের মাথা যায় গরম হয়ে। উত্তর না দিয়ে উনি আমায় প্রশ্ন করেন- ‘আর ইউ ফরম ইস্ট পাকিস্তান? বলি- ‘ইয়েস’। আর ইউ এ বেঙ্গলি? বলি- ‘ইয়েস স্যার।’ আর ইউ এ আওয়ামী লীগার? আমি বলি- ‘সরি স্যার। দিস ইজ অ্যান আর্মি ইনস্টিটিউট। হাউ ক্যান আই বি এ আওয়ামী লীগার।’ উনি উত্তেজিত হয়ে যান। বলেন- ‘ইউ অফিসার সাট আপ অ্যান্ড সিট ডাউন।’ তখন পাশে বসা সহকর্মীরা হাত ধরে আমাকে বসিয়ে দেয়। ওইদিনই বুঝেছিলাম ওরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। বরং আর্মি ক্রাকডাউন ঘটাবে।”

ওদের সামরিক প্রস্তুতিটা কেমন ছিল?

নূরুন্নবী বলেন- “কোয়েটায় ছিল সিক্সটিন রিজার্ভ ডিভিশন। একটা আর্মির লাস্ট রিসোর্স হলো রিজার্ভ ডিভিশন। কিন্তু দেখলাম কয়েকদিন পর পরই রিজার্ভ থেকে কয়েক ইউনিট ইস্ট পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে। এমন কী ঘটছে সেখানে যে রিজার্ভ থেকে সেনা পাঠাতে হবে! আমরা গোপনে এসব নিয়ে আলোচনায় বসতাম। এক সময় পাকিস্তান থেকে পালানোর পরিকল্পনা আঁটি।

২৫ মার্চে কোর্স শেষ হয়। পরদিন অনুষ্ঠান করে সনদপত্র দেওয়া হবে। এর মধ্যেই জানতে পারি জেনারেল আমার ওপর ক্ষেপেছেন। তাই আরেকটি কোর্সে এটাচ করে দিবেন। তখন কৌশলে মুভমেন্ট অর্ডার নিয়ে ওই রাতেই আমি কোয়েটা থেকে ট্রেনে করাচির দিকে রওনা হই। সঙ্গে ছিলেন রুমমেট ক্যাপ্টেন আফসার এবং অর্ডিনেন্সের ক্যাপ্টেন সামাদ।

মাঝপথে ট্রেনে শুনি হৈ হুল্লোড়। পূর্ব পাকিস্তানে মার্শাল ল দেওয়া হয়েছে। শুরু হয়েছে গণহত্যাও। সে কারণে ট্রেনে পাকিস্তানিরা আনন্দ উল্লাস করছে। বঙ্গবন্ধুকে সমানে গালাগালি করছিল তারা।

করাচির অর্ডিন্যান্স মেসে থাকার ব্যবস্থা হয় আমাদের। এরপর ২৭ মার্চ সকালের দিকে যাই আর্মি ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেকেন্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়ানকে অপারেশনের জন্য তখন ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এক পাশে ফলিং করিয়ে তাদের ব্রিফ করছেন এক অফিসার। উর্দুতে বলছিলেন- ‘হিন্দুদের দিয়ে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার কাজে নেমেছে ইন্ডিয়া। বাঙালি মালাউনদের মারার জন্য আমার যাচ্ছি। দেশ মাতৃকার জন্য এটা তোমাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। ওখানে আমরা শুধু মাটি চাই। মানুষের প্রয়োজন নেই। বাংলায় কথা বলার মতো মানুষ আমরা রাখব না।’ কথাগুলো এখনও কানে বাজে।

ট্রানজিট ক্যাম্পে সাদেক নেওয়াজ নামে এক বাঙালি সুবেদারকে পাই। আমার ইচ্ছার কথা শুনে উনি বলেন- ‘সর্বনাশ স্যার। ঢাকা যাবেন না। সেখানে সব মাইরা ফেলছে। দুই ডিভিশন তো নিজ হাতে পাঠাইছি। ওরা তো মানুষ রাখব না স্যার। খুব কষ্ট হয়।

বললাম- ‘বাঁচার জন্য না, কিছু করার জন্য যাচ্ছি।’

শুনেই মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর একটা চিরকুটে নাম, আর্মি নম্বর আর ডেস্টিনেশন লিখে দিলেন। তখন ওটাই ছিল বিমানের টিকিট। দেশে নামতেই তেজগাঁও এয়ারপোর্টকে মনে হলো যুদ্ধক্ষেত্র। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আফসার। আমরা উঠি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে, অর্ডিন্যান্স মেসে। দেখলাম কচুক্ষেতে লাশ পড়ে আছে। ক্যান্টনমেন্টের এদিকওদিক জটলা। জায়গায় জায়গায় আর্মি ট্রুপস। কোন গ্রুপ কোথায় যাবে সে ডিউটি ভাগ করা হচ্ছে। চলছে ব্রিফিংও।’

তখনও কি বাঙালি অফিসাররা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল?

তিনি বলেন- “হ্যাঁ। মেজর গোলাম মাওলার বাসা ছিল মেসের পাশেই। আমার কোরের লোক ছিলেন উনি। মিলিটারি অ্যাটাসী হিসেবে তিনি বদলি হয়ে যাচ্ছেন সৌদিতে। একদিন পরিচিতরা সবাই জড় হয় তার বাড়িতে। আসেন একরাম মোল্লা, আল ফরিদ- উনি পরে অ্যাডিশনাল আইজি হয়েছিলেন, লে. মোদাব্বির পরে আইজি হয়েছিলেন, ক্যাপ্টেন এনাম। এরা সবাই একাত্তরে পাকিস্তানিদের চাকরি করেছেন, এই ঢাকাতেই। ওইদিন স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে চাইলে মেজর মাওলা আমার ওপর খুব রেগে যান। রেডিওটা রেখে দেন আলমেরিতে। পরবর্তীতে এই দেশেই উনি মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। অথচ তখন যদি মেজর আর কর্নেলরা রিভোল্ট করতো কত বড় ব্যাপার ঘটত বলেন। মোর দেন টু হানড্রেড অফিসার ছিল ইস্ট পাকিস্তানি। অথচ এরা অধিকাংশই পাকিস্তানিদের বিশ্বাসী হিসেবে চাকরি করে গেছেন। স্বাধীনের পরে ওরাই রি-পেট্রিয়েটেড হয়ে জয়েন করেছে আর্মিতে এবং প্রমোশনও পেয়েছেন।”

সেনাবাহিনীর মধ্যে কোন বৈষম্যগুলো আপনাদের মনে রেখাপাত করতো?

প্রশ্ন শুনে নূরুন্নবী খানিক নিরব থাকেন। উত্তরে বলেন- “পপুলেশন ওয়াইজ আমরা মেজরিটি। অথচ আর্মিতে বাঙালি টেন পারসেন্টও ছিল না। ছিল না একজনও মেজর জেনারেল। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল মাত্র পাঁচটা। আট নম্বর পর্যন্ত রেইজ হয়েছে তখন। অথচ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ছিল কমপক্ষে পঞ্চাশটা। বেলুচ রেজিমেন্ট মোর দেন ফরটি। শত শত ট্যাঙ্ক আর আর্টিলারি গান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। বৈষম্য ছিল আকাশ পাতাল। ওরা প্রকাশ্যে বলত- ‘বাঙালি মাছলি খাওয়া জাত, ওরা যুদ্ধ করতে পারবে না।’ টিটকারি মারত, ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত। ইপিআরদের টর্চার করত বেশি।”

ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্রুপস নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নূরুন্নবী খান। কিন্তু সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ২৯ মার্চ ১৯৭১। সিভিল ড্রেসে তিনি চলে যান সেন্ট্রাল রোডে, খালার বাড়িতে। পরে চলে আসেন নড়াইলে। সেখানকার প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি অংশ নেন।

৮ এপ্রিল ১৯৭১। নড়াইলের ওপর পাকিস্তানি সেনারা বোম্বিং করে। তখন জিকরগাছা বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যান তিনি। কিছুদিন থাকেন গঙ্গারামপুরে, মেজর নাজমুলের সঙ্গে। তারপর চলে আসেন কোলকাতায়, আতাউল গণি ওসমানির এডিসি হিসেবে কাজ করেন কিছুদিন।

খোন্দকার মোশতাক আহমদ পুরোপুরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না বলেন মনে করেন মুক্তিযোদ্ধা নূরুন্নবী খান। উদাহরণ স্বরুপ তুলে ধরেন ওই সময়ে খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে কথোপকথনের ঘটনাটি। তাঁর ভাষায়-

“আমি তখন কোলকাতায়। একদিন নূরে আলম সিদ্দিকী এসে বলে- ‘নবী ভাই চলেন খোন্দকার ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করি। কি অবস্থা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের। একটু জানি।’

খোন্দকার মোশতাক সাহেব বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে কি যেন পড়ছিলেন!

নূরে আলম জিজ্ঞাসা করে- মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা কী? কী হবে আমাদের?

খোন্দকার মোশতাক বললেন- গোলাগুলি করে জনগণের অধিকার আদায় করতে হবে- এই রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করি না। এগুলা করেও কিছু হবে না।

– কি করতে হবে?

– কাটছাঁট করে ওরা যদি ৬ দফা মেনে নেয়। তাহলে পাকিস্তানিদের সঙ্গে নেগোসিয়েট করা উচিত আমাদের।

নূরে আলম বলেন- ‘আপনি তো প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ব্যাপারে কী কোনও স্টেপ নিয়েছেন?’

মোশতাকের উত্তর- “আমি কোলকাতায় আমেরিকার এক কনসুলেটরের সঙ্গে লিয়াজু মেনটেইন করছি। যোগাযোগ রাখছি দিল্লিতেও। তাহের ঠাকুর ও মাহবুবুর রহমান চাষীকেও কাজে লাগিয়েছি। ওরা যোগাযোগ করছে নানা জায়গায়। শেখ মুজিবকে পাকিস্তান যদি জীবিত ফেরত দেয় আর ৬ দফা কাটছাঁট করে মেনে নেয় তাহলে আমাদের যাওয়া উচিত।”

খোন্দকার মোশতাকের কথা শুনে পায়ের রক্ত মাথায় চড়ে যায়। যুদ্ধ চলছে তখন। অথচ উনি পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের চিন্তা করছেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করেছিলাম ওইদিন। এই মোশতাকই স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর খুবই আস্থাভাজন ছিলেন।”

এপ্রিলের মাঝামাঝির সময়ে কথা। মেজর শাফায়াত জামিল আসেন কোলকাতায়। তার সঙ্গেই নূরুন্নবী চলে যান রণাঙ্গণে। যুদ্ধ করেন থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে। শাফায়াত জামিল ছিলেন থার্ড বেঙ্গলের সিইও।

রেজিমেন্ট রেইজ করার দায়িত্ব তিনি দেন নূরুন্নবীকে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের পত্নিতলা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পর্যন্ত ক্যাম্পগুলো ঘুরে ঘুরে ১১শ ট্রুপসের বেঙ্গল রেজিমেন্ট গড়ে তুলেন। এরপর কয়েকটি কোম্পানি নিয়ে অপারেশন পরিচালনা করেন দিনাজপুরের বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু জুন মাসের পনের তারিখ অর্ডার আসে গারো পাহাড়ের তেলঢালায় চলে যাওয়ার।

ফাস্ট বেঙ্গল বনগাঁ থেকে আসে ক্যাপ্টেন হাফিজের নেতৃত্বে, এইট বেঙ্গল চট্টগ্রাম থেকে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে আর থার্ড বেঙ্গল আসে হিলি থেকে নূরুন্নবী খানের নেতৃত্বে। তিন বেঙ্গল মিলে একটা বিগ্রেড হয়। জুলাই মাসের ৭ তারিখে মেজর জিয়া ওই ব্রিগ্রেডের কমান্ডারের দায়িত্ব পান। ব্রিগ্রেডের নাম প্রথম ছিল ওয়ান ইবি (ইস্ট বেঙ্গল) বিগ্রেড। এরপর নাম হয় ওয়ান আর্টি (আর্টিলারি) বিগ্রেড। শেষে নাম দেওয়া হয় জেড ফোর্স।

তিন বেঙ্গলের কয়েকদিন ট্রেনিং চলে তেলঢালায়। তারপর এসিড টেস্ট হিসেবে তিন ব্যাটেলিয়ানকে তিনটা অপারেশনে পাঠানো হয়। ফাস্ট বেঙ্গল কামালপুর বিওপি, থার্ড বেঙ্গল বাহাদুরাবাদ ঘাট আর এইট বেঙ্গল নকশি বিওপি অপারেশনের দায়িত্ব পায়। একমাত্র বাহাদুরাবাদ ঘাট অপারেশনেই সফল হয় নূরুন্নবীরা।

কীভাবে তা সম্ভব হলো? তা শুনি মুক্তিযোদ্ধা নূরুন্নবীর জবানিতে।

তাঁর ভাষায়-

“যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের সংযোগস্থলে বাহাদুরাবাদ ঘাট একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা বৃহত্তর যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সৈন্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি এবং সামরিক যানবাহন রেলওয়ের মালবাহী ও যাত্রীবাহী ওয়াগনে করে বাহাদুরাবাদ ঘাট হয়েই নিয়ে যেত। তাই উত্তরবঙ্গে শক্রকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য বাহাদুরাবাদ ঘাট অচল করে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল।

ঘাটটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল ৩১ বেলুচ রেজিমেন্টের এক প্লাটুন সেনা, এক কোম্পানি প্যারা মিলিটারি রেঞ্জার এবং ৫০ জন স্থানীয় বিহারী ও রাজাকার বাহিনীর সদস্য । পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল বাহাদুরাবাদ ঘাটে। ওই ঘাটের ফেরিতে ট্রেনের ওয়াগন পারাপার হতো।

আগেই রেইকি করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয় একটি গ্রুপ আমাদের সাহায্য করে। বড় বড় ১৬ টা পাটের নৌকায় ব্রহ্মপুত্র দিয়ে এগোই আমরা। ৩১ জুলাই ১৯৭১। ভোর ৪টার মতো। মুক্তিযোদ্ধারা টর্চ মেরে সিগনাল দিতেই নৌকা ভেড়াই। ঘাটের পাশেই একটা মাদ্রাসা। নদীর মোহনায় প্রটেকশনে থাকে আলফা কোম্পানি। দায়িত্বে ক্যাপ্টেন আনোয়ার। পাকিস্তানি সেনারা গানবোট নিয়ে আক্রমণ করতে আসলে ওরা তা প্রতিহত করবে। আমার ডি কোম্পানি সামনে এগিয়ে আক্রমণ চালাবে। আর ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টার কোম্পানি নিয়ে মাদ্রাসা ঘরের মাঝামাঝিতে অবস্থান নিয়েছেন মেজর শাফায়াত জামিল স্যার। উনি আমার প্রোটেকশনে থাকবেন। মর্টার বা কাভারিং ফায়ার দিবেন। লাগলে সেনাও পাঠাবেন। আমি অপারেশনে হিট করব। এটাই ছিল পরিকল্পনা।

দিনের বেলায় পাকিস্তানি সেনাদের বড়খানা চলে দেওয়ানগঞ্জ সুপার মিলে। ফলে তারা ট্রেনের ওয়াগনে ওয়াগনে রেস্ট নিচ্ছিল। আমরা রকেট লাঞ্চার দিয়ে ওয়াগনগুলো উড়িয়ে দিলাম। ওরা টিকতে পারে না। গানবোট ছিল। ভয়ে একদল সিরাজগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়। বহু সেনা পালিয়েছে নদীর পাড় দিয়ে। ফাইট করার মতো কোনও সুযোগ আমরা ওদের দেইনি। ভোর ৪টা থেকে ৬টার মধ্যেই সব ক্লিয়ার করে ফেলি। ওই অপারেশনে সফল হলেও সুবেদার ভুলু মিয়া নামে এক প্লাটুন কমান্ডোকে আমরা হারাই ওইদিন।”

ওই সময় নির্দেশ আসে তিনটা ব্যাটেলিয়ানই সিলেট যাবে এবং সর্বপ্রথম সিলেটকে মুক্ত ঘোষণা করা হবে। তারা তখন মুভ করে শিলং হয়ে চেলা সাব সেক্টরের বাঁশতলায় অবস্থান নেয়। তারপর স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত সরাসরি অংশ নেন ছাতক, গোয়াইনঘাট, ছোটখেল, রাধানগর, সালুটিকর ও লামাকাজিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে।

এক অপারেশনে দৈবক্রমে বেঁচে যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুন্নবী খান। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। অর্ডার ছিল ছাতক দখলে নেওয়ার। অ্যাসল্টে যায় ব্রাভো আর আলফা কোম্পানি। নূরুন্নবীর গ্রুপের দায়িত্ব ছিল ছাতকের পেছনে কালারুখায়, কাটঅফ পার্টিতে। সিলেট থেকে কোন পাকিস্তানি ট্রুপস চলে আসলে তা ঠেকাতে হবে। ক্যাপ্টেন মহসিনও ছিলেন আরেক কাটআপ পার্টির দায়িত্বে, টেংরাটিলায়। কিন্তু আগেই ওই জায়গা দখলে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। এদিকে নূরুন্নবীর একটা প্লাটুনও হারিয়ে যায় হাওরে। ফলে তারা অপারেশন উইড্রো করে। দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তানি সেনারা বোবরা গ্রাম আর পশ্চিম কালারুখা ঘেরাও করে ফেলে। নূরুন্নবী, আলমগীর ও আজাদ মিয়াসহ ছিলেন তিনজন। সবার মনে অজানা আতঙ্ক।

তারপর কী ঘটেছিল?

তিনি বলেন, “সন্ধ্যার ঠিক আগের ঘটনা। আলমগীরকে বললাম এসএমজি ক্লক করে নেন। আমিও তা করি। দুইজন দুইজনকে কিল করব। কিন্তু তবুও ধরা দিব না। এর মধ্যে একটা নৌকা যাচ্ছিল। তখনই আজাদ মিয়া ওই নৌকাটি নিয়ে আসে। আমরাও দ্রুত উঠে পড়ি। পানির শব্দে বুঝে যায় পাকিস্তানি আর্মিরাও। নৌকায় চড়তেই ওরা দূর থেকে গুলি চালায়। ফলে কয়েকটা ফুটো হয় নৌকার তলায়। ফুটো দিয়ে দেদারছে পানি ঢুকতে থাকে নৌকায়। সবাই ঘামছিলাম। আলমগীর শার্ট খুলে তা দিয়ে ফুটো বন্ধ করার চেষ্টা চালাতে থাকে। আজাদ মিয়া নৌকায় দ্রুত লগি চালায়। ফলে নৌকাটি পাকিস্তানি সেনাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আজাদ মিয়ার কারণেই সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম।”

আরেকটি দুর্ধর্ষ অপারেশনের কথা শুনি মুক্তিযোদ্ধা নূরুন্নবীর জবানিতে। ওইদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি অশ্রুসিক্ত হন। একজন বীর যোদ্ধার কান্না আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলতে থাকেন ওই ঘটনার আদ্যোপান্ত। তাঁর ভাষায়-

“২৮ অক্টোবর অর্ডার আসে তামাবিল যাওয়ার। আমি তখন চারটা কোম্পানির দায়িত্বে- আলফা, ডেলটা, ইকো আর ‘ই’ কোম্পানি। রাধানগর এলাকায় পাকিস্তানিদের একটা বড় ডিফেন্স ছিল। ওটা দখল করতে হবে। আমাকে দিল জাফলং চা বাগানের পশ্চিম পাশের এলাকায়। পূর্ব সাইডে ছিল এফএফ মতিউর আর উত্তরে ফারুকের কোম্পানি। সবদিকে পজিশনে। শুধু দক্ষিণের গোয়াইনঘাট দিকটায় খোলা রাখা ছিল। যুদ্ধ চলে রাতদিন, ২৮ অক্টোবর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত। কোনদিন চারবারও অ্যাটাক হয়। ঈদের দিনেও ওরা অ্যাটাক করে।

২১ নভেম্বর, ১৯৭১। ভারতের সঙ্গে যৌথবাহিনী গঠিত হয়। ওরা সার্পোটিং ফোর্স। মেইন ফোর্সে আমরা, সামনে থাকব। কর্নেল রাজ সিং আসলেন। ২৬ নভেম্বর আসে ফাইভ ফাইভ গুরখা রেজিমেন্টও। ওরা অ্যাটাক করবে রাধানগরের ওপর। আমাদেরকে দিতে হবে গ্রাউন্ড সার্পোট।

রাধানগর-গোয়াইনঘাট রাস্তায় পাকিস্তানিদের এলএমজি আর মেশিনগান পজিশনে ছিল। ওরা সামনে যেতেই পাকিস্তানি সেনাদের এলএমজি আর মেশিন গানের গুলির মুখে পড়ে। ফলে চারজন অফিসারসহ প্রায় ৭৫ জন গুরখা সৈন্য মারা যায়।

পরদিন ২৭ নভেম্বর। রাজ সিং ২৮ তারিখ ভোর রাতে আবার অ্যাটাকে যেতে বললেন। সিদ্ধান্ত নিই সারপ্রাইজ অ্যাটাক করবো। আমার দুটো কোম্পানিতে ১৬০ জন। চারটা প্লাটুন নিয়ে যাব ফ্রন্টাল অ্যাটাকে। প্রত্যেককে দিলাম থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড। অ্যাটাকটা হবে সুইসাইডাল। শহীদ হওয়ার জন্য সবাইকে শপথও করালাম। কোন প্লাটুন কোথায়, কীভাবে, অ্যাটাক করবে সব বুঝিয়ে দিই। দৌড়ে ওদের বাঙ্কারগুলোতে উঠে যাব। ওদের পজিশনের সামান্য আগেই গ্রেনেড থ্রো করব। একসঙ্গে বিস্ফোরিত হবে ১৪০টা গ্রেনেড।

শাফায়াত জামিল স্যার এসে প্রথম রাজি হলেন না। বললেন- ‘একদিন আগেই গুরখারা মরেছে, তোমরা কেউ জীবিত ফিরবে না।’ সবাই তখন হাত তুলে বলে- ‘স্যার, শহীদ হতেও রাজি আছি।’ সবার সাহস দেখে দৃঢ়তার সঙ্গে ট্রুপসকে বললেন- ‘আমিও তোমাদের সঙ্গে শহীদ হতে চাই। তোমাদের সঙ্গেই অপারেশনে যাব।’

শাফায়াত স্যারকে দিলাম সবচেয়ে বাঁ দিকের প্লাটুনে। আমি মাঝখানে। বায়ে অন্যান্যরা। এভাবে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তানিদের দুইশ গজের ভেতর চলে যাই। খুব ভোর তখন। আল্লাহর রহমতে এতো কুয়াশা পড়েছে। খুব কাছেও কিছু দেখা যায় না। আমার নির্দেশে সবাই ওদের সীমানায় ঢুকে পড়ে নিঃশব্দে। দেখি রাইফেল পজিশনে ঘুমাচ্ছে পাকিস্তানি সেনারা। গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটালাম, ট্রুপস খেড়ের আগুন বাঙ্কারে দিতেই জীবিত পাকিস্তানি সেনারা দৌড়ে পাশের কাশবনে আশ্রয় নেয়। খুব সহজেই ওদের ক্যাম্প দখলে নিই আমরা। ওই অপারেশনে আমাদের ৮জন শহীদ হয়েছিল। শাফায়াত জামিল স্যারও গুলিবিদ্ধ হন। কাশবনে থাকা পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি তার লুঙ্গির গোছায় থাকা ম্যাগজিনে লাগায় উনি প্রাণে বেঁচে যান।

এভাবে মৃত্যুকে বাজি ধরেই ছোটখেল আর আলম নগর দখল করি আমরা। যুদ্ধ করেই দেশ পাইছি। রক্ত দিয়া এই ম্যাপ তৈরি করছি। আমাদের ম্যাপ রক্তের ম্যাপ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের ম্যাপ। দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ের ম্যাপ।“

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম খেতাব লাভ করেন। অথচ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ক্যু’র মিথ্যা অভিযোগ এনে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করাসহ তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলে- “চারটা চার্জ ছিল। চার্জে যে ডেইটগুলো দেওয়া হয়েছিল সে ডেইটগুলোতে ছিলাম বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে। মুভমেন্ট রেজিস্টারে তা ছিল লিপিবদ্ধ করা। সেগুলো উপস্থাপনও করেছিলাম। তবুও সাজা পেয়েছি। ক্যামেরা ট্রায়ালে আমার বিপক্ষে তখন ওকালতি করেছিলেন বিগ্রেডিয়ার শাখাওয়াত হোসেন (সাবেক নির্বাচন কমিশনার)। ১৮-১৯টি ক্যু জিয়ার আমলে নাকি হয়েছে। আসলে সবই ছিল বানানো। আপনি আর আমি কথা বলছি- ইনটেনশনালি ওটাকেই ক্যু বানাতো ওরা। এভাবেই আর্মি থেকে সব মুক্তিযোদ্ধা সাফ করা হয়েছিল জিয়ার আমলে। এগুলোরও বিচার হওয়া দরকার।”

স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধুর সাহসী উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন এই বীর যোদ্ধা- “ওই সময় ঘুষ, দুর্নীতি কারা করেছিল? আওয়ামী লীগেরই একটি গ্রুপ। ওদের শায়েস্তা করার জন্য বঙ্গবন্ধু বাকশাল করেছিলেন। অথচ আমরা বাকশালের দোষ দিই। দেখেন, নিজের দলের দুর্নীতি ও সুবিধাবাদীদের দমন করতে ওটা ছিল বঙ্গবন্ধুর সাহসী পদক্ষেপ।”

জিয়ার শাসনামলের মূল্যায়ন করেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর ভাষায়- “পুরো সময়টাই উনি রাজাকারদের পুর্নবাসিত করেছেন। প্রতিষ্ঠিত করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে। জামায়াতকে রাজনীতি করার বৈধতা দিয়েছিলেন জিয়া। শাহ আজিজের মতো লোক, যিনি স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধী তাকে কী কোন মুক্তিযোদ্ধা মেনে নিতে পারে? আব্দুল আলিম ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিল। তবুও সেই আব্দুল আলিমকেই উনি মন্ত্রী বানালেন। কমান্ডার হয়ে জিয়াউর রহমান আমাদের কপালে কলঙ্ক লাগিয়ে গেছেন।”

একাত্তরে হুসেন মুহাম্মদ এরশাদের ভূমিকার কথা এই বীর বিক্রম তুলে ধরেন ঠিক এভাবে-

“উনি তো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। খামখেরা সেক্টরে তিনি ছিলেন সিক্স ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিইও। ভারতীয় বর্ডারের খুব কাছেই ছিলেন। ইচ্ছে করলে পুরো ব্যাটেলিয়ান নিয়ে হেঁটেই ঢুকে যেতে পারতেন ইন্ডিয়াতে। তার এক কোম্পানি ইন্ডিয়া চলে গিয়ে পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা করেন নি। বরং মুক্তিযুদ্ধের সময়ই উনি মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হয়েছিলেন।”

যে দেশের স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, সে দেশ কি পেয়েছেন?

উত্তরে খানিক নিরবতা। তারপর বললেন- “স্বপ্ন ছিল একটা বৈষম্যহীন সোনার দেশ পাব। কোনো অন্যায় আর জুলুম নির্যাতন সেখানে থাকবে না। সর্বক্ষেত্রে ন্যায়ের শাসন থাকবে। কিন্তু আজ কেউ হাজার কোটি টাকার মালিক। আবার কারো হাতে ৫শ’ টাকাও নাই। দেশের সম্পদের আশি পারসেন্ট আছে দুই পারসেন্ট লোকের কাছে। এই বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা তো দেখি নাই।”

সামাজিকভাবেই আমরা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করি- এমনটাই যুক্তি এই যোদ্ধার।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আপনি বেতন পান বিশ হাজার টাকা। সম্পদ করেছেন বিশ লক্ষ টাকার। ওই টাকা কোথায় পেলেন? কেউ প্রশ্ন করবে না। সবাই বলবে উন্নতি হইছে বেশ। আবার এরাই মসজিদ ও মাদ্রাসায় দুর্নীতি আর ঘুষের টাকা দিচ্ছে। আর আমগো হুজুররা এদের উন্নতির জন্য দোয়া করতেছে- ‘আল্লাহ তুমি তার সম্পদ বাড়ায় দাও।’ মানে আরও ঘুষ খাওয়া আর দুর্নীতি করার ব্যবস্থা করে দাও। সমfজে এটা হলে কি ঘুষ আর দুর্নীতি বন্ধ হবে?”

কী করা উচিত?

তিনি বলেন, “১৯৭৫ সালে বিএমএ এর এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণটাই আজ বাস্তবে কার্যকর করা হোক।”

ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, এখনকার ছাত্রলীগ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

বীর বিক্রম নূরুন্নবীর উত্তর, “এখনকার ছাত্রলীগ তো ছাত্রলীগ নাই। এটাকে গুণ্ডা লীগ বানানো হচ্ছে। আমরা ছাত্রলীগ করেছি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। এখন সেটা নাই। সবখানে টাকার ছড়াছড়ি। রাজনৈতিক দলের লেজুড়ভিত্তিক কোনও ছাত্র সংগঠন এখন রাখা ঠিক নয় এদেশে। বরং হল ও ছাত্র-সংসদগুলোর নির্বাচন হওয়া উচিত নিয়মিত। যেটা বহু বছর ধরেই বন্ধ আছে।”

পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে পাহাড়সম আশা মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল এস আই এম নূরুন্নবী খানের।

তাদের উদ্দেশে তিনি শুধু বললেন, “তোমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটি জেনে নিও। ওই বীরত্বের ইতিহাসই তোমাদের পথ দেখাবে। নিজের কথা ও কাজে সৎ থেকো। মনে রেখ রক্তে পাওয়া দেশের ম্যাপটিকে তোমাদেরকেই তুলে ধরতে হবে।”

সংক্ষিপ্ত তথ্যঃ

নামঃ মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল এস আই এম নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম।

একাত্তরে ছিলেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট। আর্মি নম্বর ১২৫৮৬।

যুদ্ধ করেছেনঃ থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অপারেশন করেন দিনাজপুর, বাহাদুরাবাদ ঘাট, দেওয়ানগঞ্জ, রৌমারী, ছাতক, গোয়াইনঘাট, ছোটখেল,রাধানগর, সালুটিকর, লামাকাজিঘাট প্রভৃতি এলাকায়।

★★★লেখাটি  ইতিপূর্বে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত হয়েছে।

★★ ব্যবহৃত ছবি লেখক-গবেষক শ্রদ্ধেয় সালেক খোকনের তোলা ও সংগৃহীত।

Write A Comment

error: Content is protected !!