বাড়ী থেকে পুত্রসহ তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় অধ্যাপক ফজলে এলাহীকে

0

২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, সেদিন বুধবার।

অবরুদ্ধ ঢাকা’র নাগরিকদের মনে সার্বক্ষণিক মৃত্যু ভয় ও অজানা আশংকা। মাত্র দু’দিন আগেই ২৯ ও ৩০ আগস্ট ঢাকার অগ্রগামী গেরিলা দলটির সাত সদস্যের আটক ও অন্তর্ধানের ঘটনা যেন ঢাকাবাসীর হৃদয়ে জাজ্বল্যমান আশার প্রদীপ ম্লান করেছিল।

আটচল্লিশ বছর আগে সেদিন ঢাকা’র মনিপুরীপাড়ায় ঘটেছিল হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। ৩৭/এ, বাড়িতে সপরিবারে থাকতেন,তৎকালীন কৃষি কলেজের (বর্তমান শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ফজলে এলাহি চৌধুরী। স্ত্রী এবং পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে তিনি যুদ্ধকালীন সময়ের অনেকটা সময় নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেছিলেন।

তাঁর বড় ছেলে ফজলে কবির চৌধুরী খোকন এবং সেজো ছেলে হুমায়ুন কবির চৌধুরী মিন্টু বাঙালি জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত ছিলেন। আওয়ামীলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলেন তাঁরা। আজও,মনিপুরীপাড়ার আদি বাসিন্দারা ফজলে কবির চৌধুরী খোকন’কে ‘বড় ভাই’ হিসেবে স্মৃতিতে ধারণ করেন। সীমিত নাগরিকদের আবাস তৎকালীন মনিপুরীপাড়ায় তাঁরা ছিলেন স্থানীয়দের প্রাণ ভোমরা। অধ্যাপক ফজলে এলাহির মেজো ছেলে নজরুল ইসলাম চৌধুরী তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেডে (বর্তমান জনতা) কর্মরত ছিলেন, তিনি বিবাহিত হওয়ায় কলাবাগান এলাকায় নিজ পরিবারের সাথে থাকতেন।

জুলাই এবং আগস্টে একের পর এক গেরিলা আক্রমনে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার ভেতর প্রচণ্ড ত্রাস সৃষ্টির পর আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা’র পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।সেজো ছেলে হুমায়ুন কবির চৌধুরী মিন্টু স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিলে মনিপুরীপাড়ার স্থানীয় কতিপয় দালালদের আনাগোনা ও নজরদারি বেড়ে যায়। এমতাবস্থায়, আগস্টের ২৬/২৭ তারিখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে শহরে অবস্থান নিরাপদ না ভেবে অধ্যাপক ফজলে এলাহি মেজো ছেলে ব্যতীত সবাইকে নিয়ে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

রংপুর যাবার পথে তিনি মানিকগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছার পর বয়সজনিত কারণে আর হেঁটে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন। স্মর্তব্য, একাত্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার সাথে সাথে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও বিহারী এবং দেশীয় দালালদের নির্যাতন ও হত্যার ভয় তো ছিলই।

শারীরিক অক্ষমতার জন্য তিনি, পরিবারের সবাইকে রংপুর পৌঁছে দেবার দায়িত্ব বড় ছেলে ফজলে কবির চৌধুরী খোকন’কে দেন। কারণ, আওয়ামীলীগের সাথে যুক্ত ও স্বাধীনতা যুদ্ধে পরোক্ষ সহায়তার জন্য তাঁকে ফেরারি হয়ে থাকতে হচ্ছিল। এরপর তিনি পুনরায় ঢাকায় ফিরে এলেন তাঁর চতুর্থ সন্তান ১৬ বছর বয়সী কিশোর, কিবরিয়া এলাহি চৌধুরী বাবলা’কে সাথে নিয়ে। সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, পঁয়ষট্টি বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে কেউ কিছু করবেনা।

কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস এমন আত্মসান্ত্বনা, চরম পরিণতি থেকে সন্তানসহ তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি। সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ, দুপুর বেলা আনুমানিক ২ থেকে ৩ টার ভেতর নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে পুত্র সন্তান (বাবলা) সহ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। তুলে নিয়ে যাবার মুহূর্তে তিনি ভাত রান্নার জন্য কুলায় চালের কুড়া বাছাই করছিলেন। তাঁদের তুলে নিয়ে যাবার পরমুহূর্তে পুরো বাড়িতে চালানো হয় নির্বিচার লুঠ। অনাগত পুত্রবধূদের কথা ভেবে বানানো অলংকার ও যৎসামান্য অর্থ থেকে শুরু করে পোশাক সব কিছু লুণ্ঠন করা হয় সেদিন।

শহীদ অধ্যাপক ফজলে এলাহী

২ সেপ্টেম্বরের বুধবার ১৯৭১, নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবার পর আজ অবধি তাঁদের কোন খোঁজ মেলেনি। পাওয়া যায়নি মৃতদেহ এমনকি রমনা থানার রেকর্ড তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাঁদের তথ্য পাওয়া যায়নি। একাত্তরে সংঘটিত কোটি কোটি হৃদয়বিদারক ঘটনার মাঝে একটি ঘটনা হয়ে রইলেন, ৩৭/এ মনিপুরীপাড়া ঢাকানিবাসী শহীদ অধ্যাপক ফজলে এলাহি চৌধুরী এবং তাঁর চতুর্থ সন্তান শহীদ কিবরিয়া এলাহি চৌধুরী বাবলা।

যুদ্ধকালীন সময়েই ঢাকায় অবস্থানরত মেজো ছেলে নজরুল ইসলাম চৌধুরী সম্ভাব্য সব স্থানে তাঁদের খোঁজ করেছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পরও রংপুর থেকে ফিরে আসা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা মিলে সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু একে একে তাঁরা নিজেরাও চলে গেলেন, অন্তর্ধান হয়ে যাওয়া পিতা ও ভাইয়ের খোঁজ না পাবার বেদনা নিয়েই।

প্রফেসর এলাহীর পুত্র

উল্লেখ্য, মনিপুরীপাড়া এলাকায় ক্র্যাক প্লাটুন খ্যাত ঢাকার অগ্রগামী গেরিলা দলটির অন্যতম সদস্য বদিউল আলম বদি তপনে’র বাড়ি। কিন্তু বদিউল আলমকে ধানমণ্ডি এলাকার বাড়ি থেকে ধরিয়ে দিয়েছিল তাঁর বন্ধু ফরিদ।

একাত্তরে, মনিপুরীপাড়া এলাকা থেকে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নেবার ঘটনা এই একটিই হয়েছে। এবং আরও স্মর্তব্য যে, মনিপুরীপাড়ায় একাধিক দালাল পুরো একাত্তর জুড়ে সক্রিয় ছিল। এরা পাকিস্তানী সেনাদের তথ্য সরবরাহ করেছে, বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছে ও স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন করেছে। অধ্যাপক ফজলে এলাহি চৌধুরী ও তাঁর ছেলে বাবলা’কে তুলে নিয়ে যাবার পেছনেও এমন কোন স্থানীয় দালালের ভূমিকা থাকতে পারে।

মনিপুরীপাড়ায় ‘বড় ভাই’ খ্যাত ফজলে কবির চৌধুরী খোকন ১৯৮৮ সালে, সেজো ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু চৌধুরী ২০১৫ সালে ইন্তেকাল করেছেন। পরিবারের একাধিক সদস্য মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও কোন সনদের জন্য আবেদন করেননি। এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তীকালে পিতা ও ভাই হারানো এ পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে যে যুদ্ধ করেছেন সে কথাও কোন বইয়ের পাতায় উঠে আসেনি। যেন, যুদ্ধের পরবর্তী যুদ্ধের কোন ইতিহাস নেই!

২ সেপ্টেম্বর বুধবার ১৯৭১, অবরুদ্ধ দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া দু’জন মানুষের ইতিহাস আমাদের অজানাই থেকে যায়। হয়তো মনিপুরীপাড়ার আদি বাসিন্দারা সবাই কালের স্রোতে মিশে গেলে তাঁদের কেউই স্মরণ করবেনা। শহীদ অধ্যাপক ফজলে এলাহি চৌধুরী’র ৩৭/এ নম্বর বাড়িটি আজও পুরনো টিনশেড অবস্থায় সেদিনের বেদনা বহন করছে। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী সপরিবারে বাস করছেন পৈতৃক ভিটায়।

একাত্তর রূপকথা নয়, একাত্তর এক জলজ্যান্ত বাস্তবতার নাম। একাত্তর আমাদের গৌরব ও বেদনার অনিবার্য ইতিহাস।

গেরিলা ১৯৭১ পরিবার, এ বেদনাদায়ক অন্তর্ধানের ৪৮ তম বার্ষিকী’তে শহীদ পিতা ও পুত্রের চিরশান্তি প্রার্থনা করছি পরম করুনাময়ের কাছে।

ছবি ও তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ শ্রবণ ফয়েজ চৌধুরী (শহীদ ফজলে এলাহি চৌধুরীর নাতি)।

Courtesy:  গেরিলা ৭১

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!