বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে সে অর্থে কেউ কোনও কাজ করেননি। তার অর্থ এই নয় যে, এটা মহাভুল হয়ে গেছে এবং কাজটি কখনও হবে না। ভুল যে হয়নি তা নয়, ভুল হয়েছে। তবে এটাও সত্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যারা ভাবতে পারতেন তাদের একটি অংশকে হত্যা করা হলো একাত্তরে আর একটি অংশের অনেকের চরিত্র বদল হয়ে গেলো পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্টের পর। জাতীয় জীবনে যখন এমন একের পর এক দুর্যোগ নামে তখন অনেক কাজই পাথরচাপা পড়ে যায়। তবে সে পাথর একদিন ঠিকই পানির স্রোতে ভেসে যায়। তখন আবার পানি তার আপন গতিতে চলে অর্থাৎ কাজটি শুরু হয় তার নিজস্ব গতিতে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একদিন ঠিকই কাজ হবে। তখন বেরিয়ে আসবে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা কী ছিলো?

খুব মোটা দাগে যদি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র চিন্তা দেখতে যাই তাহলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু একটি জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি করলেও তিনি  উগ্র জাতীয়তাবাদী নন বরং বিশ্বের তাবৎ উদার আদর্শের সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রকে মেলাচ্ছেন। তাই প্রথমত বলা যায়, একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির যাত্রা শেখ মুজিবুর রহমানের মত কিছু তরুণের হাত ধরে শুরু হলেও পরিণত শেখ মুজিব যখন বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয়ে জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টি করলেন তখন তিনি অনেক পথ পরিক্রমা শেষ করেছেন।

আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে না পেরে বঙ্গবন্ধুর অনেক কথার ভুল অর্থ করেন। ক্ষতিও করেন সমাজের। যেমন বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় জাতি রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের পরিবর্তন বুঝতে হলে তাঁর ছোট্ট একটি কথা, যা নিয়ে অনেক ভুল অর্থ হয়, অথচ সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর উদারতা, তাঁর চেতনায় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তন ও জাতি রাষ্ট্রের উদার মানবিক চরিত্র।

তিনি মানবেন্দ্র লারমাকে বলেছিলেন, ‘তোরা বাঙালি হয়ে যা।’ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এর ভুল অর্থ করেন। তাঁরা বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি নৃগোষ্ঠির আত্মপরিচয়কে, চাকমা সত্ত্বাকে অস্বীকার করেছিলেন। বাস্তবে ওই সময়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ছোট গণ্ডির মধ্যে বসে থাকলেও বঙ্গবন্ধু- একটি রাষ্ট্রের ও জাতির স্রষ্টা হিসেবে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেইখানে- যেখানে জাতীয়তাবাদ কোনও ভাষা, ধর্ম, নৃগোষ্ঠি, সম্প্রদায়, বর্ণ কোনও কিছুতে আবদ্ধ থাকে না। যেখানে জাতীয়তাবাদ একটি কনসেপ্ট, যার ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি। সে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, নৃগোষ্ঠি সকলকে ধারণ করতে পারে তার আওতার ভেতর। একটি সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষাই যেখানে জাতীয়তাবাদের অন্তরের মূল স্রোতে।

কোন জাতীয়তাবাদী নেতা যখন তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় জাতীয়তাবাদকে ভাষা, নৃগোষ্ঠি, ধর্ম বা বর্ণ থেকে বের করে আনতে পারেন, তিনি তখন তাঁর জাতীয়তাবাদের অনেকগুলো ‘কেমিক্যাল যোজনী’ তৈরি করতে পারেন। যার  মাধ্যমে পৃথিবীর অনান্য আদর্শকে ধারণ করা ওই জাতীয়তাবাদীর পক্ষে সম্ভব হয়। প্রথমেই যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো- ওই জাতীয়তাবাদী যেমন উগ্র হতে পারেন না, তেমনি তাঁর দেশের জাতীয়তাবাদ কখনই কোন উগ্ররূপ নিতে পারে না।

কোন রাষ্ট্র নায়ক বা জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা যদি তার জাতীয়তাবাদকে এই অবস্থানে নিয়ে যান তখন তাঁর রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে উদার ও মানবিক রাষ্ট্রের পথে হাঁটা শুরু করতে পারে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে যদি এভাবে উদারতান্ত্রিকতা ও মানবিকতার সঙ্গে না মেলানো যায় তাহলে ওই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা এক ধরনের উগ্রতা থেকে কখনই বের হতে পারে না। যা অনেকটা তথাকথিত মৌলবাদী ধারণার কাছাকাছি চলে যায় অনেক সময়।

আমার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দৃঢ় বন্ধনে নিজেদেরকে শুরুতে আবদ্ধ করলেও রাষ্ট্র সৃষ্টির পথ পরিক্রমায় বঙ্গববন্ধু ধীরে ধীরে আমাদেরকে কনসেপ্টভিত্তিক জাতীয়তাবাদে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদের রাষ্ট্রভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠের সচল এবং সাহিত্য ভাণ্ডারে ভরপুর ( যে ভাষার সাহিত্য নোবেল পুরস্কার শুরু হবার মাত্র কিছু দিনের ভিতরই নোবেল পায়। তাছাড়া এ ভাষার বেশ বড় সংখ্যক লেখক নোবেল পাবার যোগ্য) ভাষা। এই ভুখণ্ডে আর কোন সজীব ভাষা নেই। তাই অন্য ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেবার প্রশ্ন ওঠেনি।

তবে বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের যে উদারতা তাতে বলা যায় যদি আমাদের দেশে বাংলা ভাষার মত পাঁচটি সজীব ভাষা থাকতো বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়নের সময় সবগুলো ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতেন। কারণ, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার একটি লিখিত ফসল বাহাত্তরের সংবিধান। এই সংবিধানে কোথাও বিন্দুমাত্র উদারতার ঘাটতি নেই। বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতায় কখনও কখনও মনে হয় উদারতা এখানে অনেক বেশি।

যাহোক, আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলে তৈরি হয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার জাতীয়তাবাদ। এই রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু কীভাবে আওতা বাড়িয়েছেন তার জাতীয়বাদের- যা সৃষ্টি করে একটি উদার রাষ্ট্রের?  আটচল্লিশে বঙ্গবন্ধু যখন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আন্দোলন শুরু করেন তখন আন্দোলনটি সীমাবদ্ধ ছিলো শুধু মাত্র ভাষার ভেতর। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, এতিহাসিক ভাষাভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদকে খুব ভালো অর্থে দেখেননি, কোন একক শ্রেষ্ঠত্বের মত এখানেও একটি গণ্ডি এসে যায়। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তায় বিষয়টি যে খুব পরিষ্কারভাবে ছিলো তা বোঝা যায়, ৪৮ থেকে ৫২ অবধি ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে জয়ী হবার পরে বঙ্গবন্ধু ’৫৫ তে তাঁর দলের কাঠামোতে পরিবর্তন আনেন। কারণ, তখন তিনি স্থির হয়ে গেছেন, এই দলটিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করবে। আর রাষ্ট্র হবে সকলের জন্যে। তাই যে রাজনৈতিক দলটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করবে ওই রাজনৈতিক দলটিকে অবশ্য সকলের জন্যে হতে হবে।

তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের পরিবর্তন ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ করেন। আগে যেটা ছিলো জনগণের মুসলিম লীগ বা সাধারণ মানুষের মুসলীম লীগ সেটাকে তিনি জনগণের লীগ বা জনগণের দলে পরিবর্তন করেন।  অনেক ধরনের মানুষ মিলেই জনগণ, তাই জনগণ সব সময়ই সেক্যুলার ও মানবতাবাদী। সকল মানুষ যখন মিলিত হয় অর্থাৎ জনগণে রূপান্তরিত হয় তখন তাঁদের নিজস্ব ধর্ম হয় মানবতার ধর্ম – যার কোনও আলদা আলাদা গণ্ডি নেই। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে তাঁর যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র সৃষ্টি করেন সেটাকে মানবতাবাদী বা সকলের জন্যে উদার একটি দলে পরিবর্তন করেন।

এরপরে বঙ্গবন্ধু একটি রাষ্ট্রের জন্যে অনিবার্য যে বিষয়টি তাঁর দেশের মানুষের সামনে নিয়ে আসেন তা হলো, তাঁর জাতিগোষ্ঠির জন্য একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক অবস্থান দরকার। পৃথিবীতে কোনও রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র কায়েম হবার আগেই মার্কস রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্যে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। মার্কসের অর্থনৈতিক কর্মসূচি যেমন তাত্ত্বিক তেমনি বাস্তব প্রয়োগের জন্যও। তারপরও অন্য সকল অর্থনীতিবিদের মতো মার্কসের অর্থনৈতিক কর্মসূচিও কোন একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য বেশি প্রযোজ্য। বঙ্গবন্ধুর আগে একমাত্র সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হবার পরে তিনি স্বাধীন ভারতের জন্য অর্থনৈতিক অবস্থানটি পরিষ্কার করেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনেক মিল আছে সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে। সর্বোপরি দুজনই অসম্ভব রকম গতিশীল নেতা। সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্যে জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নেবার ফলে পৃথিবীর ইতিহাসে ভিন্নভাবে চিহ্নিত হয়েছেন বটে, তবে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় তিনিও জাতীয়তাবাদকে নিয়ে এসেছেন একটি কনসেপ্টে, কোনও ভাষা বা ধর্ম- বর্ণের ভিত্তিতে নয়। যে কারণে তিনিই ভারতবর্ষে একমাত্র নেতা যিনি সকলকে এক করতে পেরেছিলেন শুধু মাত্র রাষ্ট্র গঠনের নামে। সুভাষ চন্দ্রের অর্থনৈতিক কর্মসূচি যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার ভেতর বসে স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্যে ছিলো বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক কর্মসূচিও পাকিস্তান কাঠামোর ভেতর বসে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ছিল। তাঁর ছয় দফা মূলত একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্যে তার মানুষের ভেতর অর্থনৈতিক চেতনা জাগানো।

অর্থাৎ এর থেকে দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় চেতনা ছিষট্টি সালে অর্থাৎ ছয় দফা ঘোষণার পরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা থেকে আরো বিস্তৃত হচ্ছে। কারণ ভাষা নিঃসন্দেহে একটি গোষ্ঠির, তা সে গোষ্ঠি যত বড় এবং শতকরা যত বেশি হারের হোক না কেন। কিন্তু অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচি? এটা সকলের জন্য। বঙ্গবন্ধু ভাষার পরে অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচি দিয়ে তাঁর ভূখণ্ডের সকল মানুষকে এক করে ফেললেন।  সৈয়দ মুজতবা আলী  সকল মানুষকে এক করা নিয়ে সুভাষ বোস সম্পর্কে যে উদাহরণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও সেটাই প্রযোজ্য।

মুজতবা আলী লিখেছেন, “সুভাষ বোস ভারতবর্ষের মানুষকে এক করেছিলেন, অত্যন্ত সোজা কথা বলে- ‘যে ঘরে আগুন লেগেছে যে যেমনে পারো পানি নিয়ে এসো আগুন নেভাতে হবে। তিনি বলেননি, আগে হিন্দু যাবে, না মুসলিম যাবে, এই সমস্যার সমাধান করে নিয়ে তারপরে কে পানি নেবে, কে কলসী আনবে এটা ঠিক করতে হবে।”

বঙ্গবন্ধুও তেমনি তার ভূখণ্ডে কোনও ধর্মের, কোনও বর্ণের, কোন নৃগোষ্ঠির কী মানুষ আছে তা নিয়ে কোন মাথাব্যথার কারণ তৈরি করেননি। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ভূখণ্ডে এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি দরকার।

এখানে এসে দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু তার জাতি রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদকে ভাষা থেকে অর্থনৈতিক কর্মসূচি অব্দি নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ভূখণ্ডের সকল মানুষের জন্যে একটি কর্মসূচি দিয়েছেন। এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়েই সামরিক আইনের অনেক ধারা মেনে নিয়ে নির্বাচনে যান বঙ্গবন্ধু। দেশের মানুষ তাঁর ওই কর্মসূচিকে ভোটের মাধ্যমে তাদের নিজেদের কর্মসূচি করে নেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নৃগোষ্ঠি সব ভুলে সকলে এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা যখন অস্ত্রের ভাষায় এর জবাব দিতে গেছে তখন দেশের সব মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। আর ততদিনে স্লোগান উঠে গেছে- তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। অর্থাৎ আমাদের ঠিকানা আমাদের ভূখণ্ডভিত্তিক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিধৌত এই এলাকার আমরা সকলেই এক। আর এরপরে সকলের আত্মত্যাগে, রক্তদানে সৃষ্টি হয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের।

অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র সৃষ্টির নির্দিষ্ট পথ পরিক্রমায় তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি উদারনৈতিক ও ভূখণ্ডের সকলকে আত্মস্ত করার সংজ্ঞা সৃষ্টি হয়ে গেছে। যা হয়তো আমরা এভাবে বলতে পারি, আমরা যে জনগোষ্ঠি ১৯৪৮ সালে ভাষার চেতনায় জাগ্রত হয়ে পথ পরিক্রমা শুরু করি, ১৯৬৬ সালে অর্থনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে ভূখণ্ডের সকলে এক হয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে অগ্রসর হই;

এই অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে রক্ত ও জীবন দিয়ে তৈরি করি নিজেদের একটি ভূখণ্ড আর পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত এ ভূখণ্ডের সকলে চিহ্নিত হই বাঙালি বলে। অর্থাৎ এখানে দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু তাঁর জাতি রাষ্ট্রের মানুষকে একত্রিত করে যে বাঙালি তৈরি করছেন তা কোন ভাষাভিত্তিক বাঙালি শুধু নয়, একটি আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত একটি জাতি গোষ্ঠি- যার নাম বাঙালি। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা বাইরের বাংলাভাষী হাজার বছরের বাঙালি বংশোদ্ভুত হলেও তাঁরা এ ভূখণ্ডের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একাত্ম নয়, তারা কেবল ঐতিহাসিকভাবে একই বংশোদ্ভূত।

তাই বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্র সৃষ্টির কাজটি সম্পন্ন করলেন, ততক্ষণে তাঁর মানুষ ও রাষ্ট্র উদার ও মানবতাবাদী। যার সঙ্গে গণতন্ত্রী বা সমাজতন্ত্রী কারো মিলতে বা মিশতে কোন অসুবিধা নেই। এর পরেই বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তার দ্বিতীয় ধাপ আসে অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রকে সাজানো। যে কর্মসূচি নেবার পরে বঙ্গবন্ধু প্রতি বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়েছেন।

আজ কিছু অর্বাচীন বঙ্গবন্ধুর এই অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচিভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামোর চিন্তাকে একদলীয় শাসন বলে। অথচ তারা এইটুকু বোঝে না যে, বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জাতি সৃষ্টি করেছিলেন, তাই সে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা এগিয়ে যাবে। তিনি অবশ্যই তাঁর রাষ্ট্র কাঠামো অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সাজাবেন।

বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে আজো অবধি বাংলাদেশ আর ওই রাষ্ট্র চিন্তার পথে যেতে পারেনি। তবে এখনও যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর ওই রাষ্ট্র কাঠামো বিবেচনা করি, বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাবো, বৈষম্যহীন বা কম বৈষম্যের বাংলাদেশ গড়তে হলে, যে অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রয়োজন সেটা বঙ্গবন্ধুর ওই অর্থনৈতিক কর্মসূচির জন্যে নেওয়া রাষ্ট্র চিন্তাই। আর ওই কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় চিন্তার সঙ্গে  যুক্ত করতে হলে বঙ্গবন্ধু যে আদলে রাষ্ট্রের প্রশাসন কাঠামো গড়তে চেয়েছিলেন ওই পথে এগুনো ছাড়া খুব কোন বিকল্প নেই।

স্বদেশ রায়
সাংবাদিক

Write A Comment

error: Content is protected !!