বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি, সুনির্দিষ্টভাবে বললে বঙ্গবন্ধুর ইসরাইল পলিসি নিয়ে একটি আলোচনা দেখলাম। একজন আপা এ নিয়ে অভিমত জানতে চেয়েছেন।

সত্তুরের দশকে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত ইস্যু ছিল ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সমস্যা। ৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা ও নৃশংস নির্যাতন শুরু করলে এ বর্বরতার প্রথম প্রতিবাদ জানায় ইসরাইল, অতঃপর ভারত।

২৯ মার্চ, ৭১, তেলআবিবে তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যার় জন্য পাক বাহিনীকে দায়ী করে নিন্দা জ্ঞাপন করেছিলেন। উক্ত প্রেস কনফারেন্সে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।

৩০ তারিখ বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে সৌদি গেজেটে এই মর্মে সংবাদ ও সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়:

শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ভারত ও ইসরাইলের সহযোগিতায় পাকিস্তান ভাঙ্গতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করেছেন এবং ইসরাইল পালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে আমরা এতদিন যাবত যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম তা আজ সূর্যের আলোর মত সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। অতএব মুসলিম উম্মাহর আর বসে থাকার সময় নেই।….”

মুক্তিযুদ্ধে আমরা ভারতের কাছ থেকে যে সামরিক সহযোগিতা পেয়েছি তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এসেছিল ইসরাইল থেকে। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ইসরাইলও চেয়েছিল একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তার পক্ষে থাকলে অবস্থান দৃঢ় হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যদি আবেগে আপ্লুত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলে তার মূল্য দিতে হতো দেশের সাত কোটি মানুষকে।

জাতীসংঘে ভাষণদান কালে

সে সময়ের প্রেক্ষাপট কি ছিল?

তুরস্ক ছাড়া সকল মুসলিম দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে একজোট। ৭৩ সালে যুদ্ধও হয়েছে যেখানে মিশর ও সিরিয়া নেতৃত্বে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো অংশগ্রহণ করে। ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরাইলের প্রতি সহমর্মী হলেও রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের কোনো স্বীকৃতি ছিল না।
ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন মানেই ছিল সকল মুসলিম দেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। ফলে পেট্রো ডলারের প্রভাবে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বেশিরভাগ দেশের স্বীকৃতি পাওয়া যেত না। জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া তো দূর অস্ত! জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে আমাদেরকে পাকিস্তানের সমর্থন নেয়ারও প্রয়োজন হয়েছিল।

বিশ্বে ব্যর্থ স্বাধীনতা সংগ্রামের দৃষ্টান্ত কম নয়। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফল করার জন্যই প্রয়োজন হয় একজন বঙ্গবন্ধুকে। আলবেনিয়া স্বাধীনতা লাভের পর যুক্তরাষ্ট্র সহ কয়েকটি দেশের স্বীকৃতিও পেয়েছিল, কিন্তু অন্যান্য দেশের চাপে সদ্য স্বাধীন দেশ ছয় মাসের মধ্যে দ্বিখণ্ডিত হয়। কাতালোনিয়া স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক সমর্থন না পাওয়ায় তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি।

বায়াফ্রার ঘোষণা ছিল ৭ই মার্চের অনুরূপ। ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করা বায়াফ্রার জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা, নিজস্ব কারেন্সী সবই ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাবে হারিয়ে গেছে সেই দেশটি।

ইসরাইলের প্রতি আমরা নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতার কারণে নেয়া পদক্ষেপ যদি নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তাহলে তা দূরদর্শি কোনো নেতাই করবেন না। বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ৭৩ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ইসরাইলের সহযোগিতার অসম্মানও করেন নি তাই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বলয় থেকে বেরিয়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে সক্রিয় হয়েছিলেন। এক কথায় বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা গবেষণার বিষয় হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বিন্দুমাত্র।

আব্দুল্লাহ হারুণ জুয়েল
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Write A Comment

error: Content is protected !!