৬০-এর দশকে বাংলার নারীরা যতোটা প্রগতিশীল, পরিশ্রমী ও মহিয়সী ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে নারীরা হয়ে গেছে ঠিক তার উল্টো। শহরের শিক্ষিত নারীরা হয়ে গেছে হিজাবী ও অলস। বাংলার নারীরা দিন দিন প্রগতিশীলতার বাইরে চলে যাচ্ছে অন্ধ বিশ্বাসের বলি হয়ে। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্মীয় ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে। বিজ্ঞানভিত্তিক ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার জন্যই মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করে জীবন দিয়েছে। কিন্তু তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা আমরা কতোটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি

বিজ্ঞানভিত্তিক ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য যে নেতৃত্বের প্রয়োজন, সেই নেতৃত্বের তীব্র সঙ্কট রয়েছে আমাদের দেশে। প্রগতিশীল নেতৃত্ব বিভিন্নভাবে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি যদি প্রগতিশীল হতে চান, আপনাকে অবশ্যই সাংস্কৃতিক মনস্ক হতে হবে এবং দেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে হবে। সাংস্কৃতিক জ্ঞানশূন্যতাই আমাদের মনকে ভোগবাদী ও উগ্র করে।

বস্তুতঃ সাস্কৃতিক চেতনাসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে যে নেতৃত্বের প্রয়োজন, সেই নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা ও মূল্যবোধ কোন্ পর্যায়ে রয়েছে, সেটা অবশ্যই দুঃশ্চিন্তার বিষয়।

পূঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এই কারনে যে, মানুষ তার ক্ষমতা ও অর্থ-সম্পত্তির লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। তার চাহিদা অনেক। তার আরোও চাই। এই “আরোও চাই, অনেক চাই” মানসিকতাই তার সাংস্কৃতিক মননশীলতাকে ধ্বংস করে। এখানে অবশ্যই পূঁজিবাদ বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে তথা গণতন্ত্রের জন্যই। উৎপাদনশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যই আমরা সংগ্রাম করেছি। কিন্তু যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুৎপাদনশীল সমাজকে প্রশ্রয় দেয় এবং প্রভাবিত করে, সেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিকে আমাদের অবশ্যই আলোকপাত করা প্রয়োজন। বাঙ্গালী সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে উৎপাদনশীল সমাজের পক্ষেই রয়েছে আবহমান কাল ধরেই।

সুতরাৎ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীল ও কর্মমুখী সমাজের কোন বিকল্প নেই। উৎপাদনশীল সমাজ বিকশিত হওয়ার মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কর্মমুখী ও উৎপাদনশীল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে হয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমাজে যে মূল্যবোধ সৃষ্টি করেছিল, সেই মূল্যবোধ থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে চলে যাচ্ছি রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য। কারন রাজনীতিতে আদর্শ নেই। নেই নৈতিকতা। আমাদের ভিতরে আত্মত্যাগের পরিবর্তে স্বার্থপরতাই বেশী কাজ করছে। ভোগবিলাসীতার দিকেই আমরা ধাবিত হচ্ছি ক্রমবর্ধমান হারে। ফলে আমরা হয়ে যাচ্ছি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধহীন ও আত্মকেন্দ্রীক। ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্ধত্ব চেপে বসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়, যা সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক।

আমাদের প্রয়োজন সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মমুখী টেকশই পরিকল্পনা, যা উন্নত বিশ্ব অনুসরণ করছে নিজেদের আধুনিক ও প্রগতিশীল শিক্ষা নীতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে।

-হীরক রাজা

Write A Comment

error: Content is protected !!