প্যারানয়া
————-
প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে এমন ব্যক্তিরা খুব কমই মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। এ ধরনের রোগীর মনোচিকিৎসকের পরামর্শ বা চিকিৎসা না নেয়া যেন তাদের প্রকৃতি। সাইকোসিস বা বড় মাত্রার মানসিক রোগীর সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকে না, প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার একটি সাইকোসিস জাতীয় মনোরোগ। নানা ধরনের ড্রাগস বা ওষুধ সেবনে প্যারানয়েড টাইপের মনোসমস্যা, চিন্তা-ভাবনা ও আচরণ দেখা দিতে পারে। যেমন- কোকেইন, পিসিপি, এমফিটামিন, মারিজুয়ানা, এলএসডি ইত্যাদি। (আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, অতিমাত্রায় ধার্মিক লোকদের মধ্যেও এই সমস্যাটি স্বল্প থেকে তীব্রমাত্রায় দেখা যায়।)

যেসব রোগী সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে তারা যদি এসব ড্রাগস সেবন করে তাদের উপসর্গ বা লক্ষণসমূহ আরো প্রচণ্ড আকার ধারণ করে, যা মারাত্মক পরিণাম ডেকে নিয়ে আসতে পারে। বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণাতে এসব ড্রাগস কীভাবে ব্যক্তির আচরণে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বিভিন্ন প্রাণরাসায়নিক কারণ নির্ধারণ করেছেন। যেগুলো প্যারানয়েড ডিসঅর্ডারে নিউরোকেমিস্ট্রি জানতে আমাদের সাহায্য করবে। যারা প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে তাদের সাধারণত খুব বেশি মাত্রায় ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস ও হ্যালুসিনেশন বা অমূলক প্রত্যক্ষণ হয়ে থাকে। তারা গায়েবি আওয়াজে শোনে যে, কেউ তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, তার মনের কথা কেউ বিশেষ পদ্ধতিতে বা বিশেষ উপায়ে জেনে ফেলছে, রেডিও-টিভি বিশেষ পদ্ধতিতে তার চিন্তা-ভাবনাকে প্রচার করছে। এসব রোগীর কর্মক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা কমে যায়, আবেগজনিত প্রকাশ অনেক মাত্রায় কমে যায়।

যাদের অপেক্ষাকৃত মৃদু মাত্রার প্যারানয়েড ডিসঅর্ডার থাকে তারা সাধারণত ডিলিউশন অব পারসিফিউশনে ভোগে, ঈর্ষাজনিত ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভোগে, ভ্রান্ত বিশ্বাস ব্যতীত এদের চিন্তা-ভাবনার ধরন পরিষ্কার ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকে তারা কোনোভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে। এদের আবেগজনিত প্রকাশ ও আচরণ দিয়ে সমাজে কোনোভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। পরিবারে কোনোভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। এরা দ্বিধান্বিত অবস্থায় ভুগে থাকে, কোনো সমঝোতা বা মীমাংসায় আসে না, সহজে কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না।

যারা প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়াতে ভুগছে তাদের বোঝার ক্ষমতা অনেকটা কমে যায়। প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে যারা ভুগছে তারা সাধারণত অহেতুক যুক্তিহীন কুতর্কে জড়িয়ে যায় অতিরিক্ত আবেগজনিত প্রকাশের জন্য এরা অন্য লোকদের থেকে বা সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। যারা তাদের অন্তরঙ্গ তাদের এরা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে থাকে। আবার অন্যদিকে এদের দেখা যায় যে, এরা বেশি বাস্তব যুক্তিবাদী এবং উদ্দেশ্যমূলক চিন্তাধারার অধিকারী বলে মনে করে।

যারা প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছেন তারা অতিমাত্রায় সতর্ক এবং সংবেদনশীল হয়ে থাকেন। কাউকে কোনো রকম সন্দেহ করলে বা ষড়যন্ত্র করলে ব্যক্তি অত্যন্ত ক্ষেপে গিয়ে মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। অথচ প্রকৃত অর্থে তার বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা বা ষড়যন্ত্র করা হয়নি। এরা সামান্যতম সমালোচনা সহ্য করে না, কিন্তু
অন্যের ব্যাপারে এরা অনেক বেশি সমালোচনাশীল হয়ে থাকে। এরা কোনো দোষ করেও তা স্বীকার করে না। এ ধরনের রোগীরা সামান্য ব্যাপারকেও বড় আকারে পরিণত করে ফেলতে পারে।

এদের সন্দেহের যে প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণ তা সাধারণত অবিরত এবং দীর্ঘমেয়াদি টাইপের হয়। যারা সন্দেহবাতিকতাজনিত ব্যক্তিত্ব জটিলতায় ভুগছেন তারা সর্বদাই আশপাশের লোকজনকে লক্ষ্য রাখেন এবং তারা পৃথিবীটাকে একটি ভয়ানক স্থান বলে মনে করেন। প্যারানয়েড পার্সোনালিটি সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তি যখন প্রথম চাকরি বা কর্মজীবন শুরু করেন বা কারো সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তখন তারা বেশ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন। তাদের সাথে বা আশপাশে যারা রয়েছেন তাদের তিনি যতক্ষণ না বিশ্বাসের সাথে দেখেন ততক্ষণ ভয়ভীতিতে থাকেন এবং সেই ভয়ভীতিকে তারা এড়িয়ে চলতে পারেন না। ব্যক্তিত্ব সম্পর্ক বা বিয়েশাদি বা দাম্পত্য জীবনের বেলায় এদের এই সন্দেহপ্রবণতা একেবারে লাগামহীনভাবে প্যাথলজিক্যাল হতে পারে এবং এরা প্রায়ই স্ত্রীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন, ঈর্ষাপরায়ণ হন এবং ধারণা করতে থাকেন যে তার স্ত্রীর কারো সাথে প্রণয়পূর্ণ অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের সন্দেহবাতিকতার ফলে দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে অশান্তিময়তা ও জ্বালা-যন্ত্রণা। ফলে স্বামী বা স্ত্রী একজন আরেকজনকে প্রতিনিয়তই সন্দেহ করতে থাকে। এ সন্দেহপ্রবণতা এত বেড়ে যায় যে, তা কল্পনারও বাইরে চলে যায় যার ফলে দাম্পত্য জীবন শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।

প্যারানয়েড পার্সোনালিটি এককভাবে এবং অন্যান্য মানসিক রোগের সাথে প্রকাশ পেতে পারে, তবে যে কারণেই প্রকাশ পাক, আসল কথা হলো মনোচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারণ মনোচিকিৎসার মাধ্যমেই রোগীর সমস্যা দূর করা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই এক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন এবং তিনি যে চিকিৎসাব্যবস্থা দেবেন তা নিয়মিতভাবে ফলো করলে রোগীর প্যারানয়েডজনিত জটিল জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

ডিলিউশন ও প্যারানয়েড

এক ধরনের ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস দেখা যায় যাকে বলা হয় ইরোটিক ডিলিউশন। এ ধরনের বিশ্বাসের শিকার সাধারণত অল্প বয়সের তরুণ-তরুণী বা যুবক-যুবতীরা হয়ে থাকেন। তারা খুব বিখ্যাত নায়ক-নায়িকা বা বিখ্যাত কোনো পাবলিক ফিগারকে মনে মনে তীব্রভাবে ভালোবাসতে শুরু করে। এসব ভালোবাসার সমর্থনে দেখা যায় তারা তাদের কাছে প্রচুর চিঠি লেখে, টেলিফোনে কথা বলে, বারবার দেখা করে, কখনো ফুল বা গিফট পাঠিয়ে চমকিয়ে দিতে চায়, ইত্যাদি নানারকম কর্মকাণ্ড করে থাকে। এগুলো এক ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাসজনিত বা ডিলিউশনাল সমস্যা।

যারা গ্রান্ডিউজ ডিলিউশন নামক ভ্রান্ত বিশ্বাসে আক্রান্ত তারা মাঝে মাঝে ধারণা করে যে, তাদের বিশেষ কোনো পাওয়ার বা শক্তি রয়েছে এবং সেই পাওয়ার বা শক্তি দিয়ে সে যে কোনো রোগ নিরাময় করতে পারবে বা যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারবে। তারা ভাবতে পারে যে তারা দারিদ্র্র্য দূর করতে পারে, পৃথিবীতে শান্তি কায়েম করতে পারে, অদ্ভুত কিছু করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে।

ডিলিউশনাল ডিসঅর্ডার বা ভ্রান্ত বিশ্বাসজনিত যে মানসিক ব্যাধি তা যদিও মারাত্মক তবুও নানা ধরনের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় ও সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এসব ব্যক্তি সাধারণত খুব বিরল ক্ষেত্রে হোমিসাইডাল বা আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। তবে ডিলিউশনাল রোগীরা সাধারণত রাগান্বিত থাকে। সব কিছুতেই অহেতুক ভয় বা ভীতিতে ভুগে থাকে। খুব বিরল ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক ডিলিউশনাল ডিসঅর্ডারের রোগী আক্রমণাত্মক হয়ে যেতে পারে, তবে যারা ভায়োলেন্ট বা আক্রমণাত্মক হয় তাদের বেশির ভাগই শিকার হয়ে থাকে তাদের প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীরা। নানা ধরনের গবেষণা সমীক্ষায় মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞগণ প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং ডিলিউশনাল বা ভ্রান্ত বিশ্বাসজনিত ডিসঅর্ডারের মধ্যে কিছু পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। এটি সাধারণত প্যারানয়েড বা সন্দেহবাতিকতাজনিত ব্যক্তিত্ব থেকে প্রবলতর হয়ে থাকে। এতে রোগীর অন্য কোনো মানসিক অসুখের উপসর্গ ছাড়াই কেবল অবধারিত ও বিরামহীনভাবে ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ডিলিউশনাল প্যারানয়া বিরাজ করে।

যারা প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে তারা অতিমাত্রায় সতর্ক বা সংবেদনশীল হয়ে থাকে। কাউকে কোনো রকম সন্দেহ করলে বা তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে খেপে গিয়ে আক্রমণ করতে পারে অথচ প্রকৃত অর্থে তার বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা বা ষড়যন্ত্র করা হয়নি। প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে যারা আক্রান্ত তারা যে দোষী তা স্বীকার করতে চায় না এবং সামান্যতম সমালোচনা পর্যন্ত এরা সহ্য করতে পারে না। অধিকন্তু অন্যের ব্যাপারে এরা অনেক বেশি সমালোচনাশীল হয়ে থাকে।

প্যারানয়েডের মূল উপসর্গ হলো সন্দেহজনিত চিন্তা ও সন্দেহজনিত আচরণ। যারা প্যারানয়াতে ভুগছে তাদের সাধারণত খুব বেশি মাত্রায় ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস ও হ্যালুসিনেশন হয়ে থাকে। তারা নিজেদের কানে গায়েবি আওয়াজ শুনতে পায়, কেউ তাদের ক্ষতি করছে, তাদের পেছনে লেগে আছে, তাদের মনের কথা জেনে ফেলছে, ইত্যাদি সন্দেহবাতিকতা বা ভ্রান্ত বিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

যাদের অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় প্যারানয়েড ডিসঅর্ডার থাকে তারা সাধারণত ডিলিউশন অব পারসিকিউশন বা ঈর্ষাজনিত ডিলিউশনে ভুগে থাকে। তারা কোনোভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে এবং এদের আবেগজনিত প্রকাশ ও আচরণ দিয়ে সমাজে কোনোভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। ভ্রান্ত বিশ্বাস ব্যতীত তাদের চিন্তা-ভাবনার ধরন পরিষ্কার ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকে। কিন্তু যারা প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত তাদের বোঝার ক্ষমতা অনেকটা কমে যায় এবং তারা দ্বিধান্বিত অবস্থায় ভুগে থাকে।

যেসব ব্যক্তি প্যারানয়েড ডিসঅর্ডারে ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভুগছে তারা সবাই কী অবিশ্বাস করে বা কী সন্দেহ করে তা নির্ণয় করা কোনো কোনো সময় একটু কঠিন হতে পারে। মনোচিকিৎসকের সাথে কথাবার্তা চলাকালীন এরা খুব বেশি মাত্রায় প্রতিক্রিয়ান্বিত হয় এবং চিকিৎসককেও পর্যন্ত সন্দেহ করা শুরু করে দেয়। তাই অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সাধারণত রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীর অতীত মেডিকেল ইতিহাস নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। ফলে রোগীকে তিনি নানা রকমের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন। রোগ নির্ণয় হয়ে যাবার পর শুরু হয় রোগীর মনোচিকিৎসা। এসব চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাথে সাথে অন্যান্য মানসিক রোগ আরোগ্যকারী থেরাপি চলতে পারে।

প্যারানয়ার অর্থ হলো সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা। প্যারানয়ার সাথে জেনেটিক বা বংশগত সম্পর্ক বা যোগাযোগ রয়েছে কিনা তা নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, যেসব পরিবারে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত রোগী রয়েছে সেসব পরিবারে সিজোফ্রেনিয়া বা ডিপ্রেশনের রোগীও রয়েছে এ ধারণা ঠিক নয়। তারপরও দেখা গেছে যে, প্যারানয়ার সাথে জেনেটিক বা বংশগত কিছু উপাদানের মিল রয়েছে। গবেষণাটি করা হয়েছিল যমজ বাচ্চার ওপর, যাদের সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে প্যারানয়ার উপসর্গ ছিল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত আর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে সিজোফ্রেনিয়ার রোগী আছে সেসব ক্ষেত্রে প্যারানয়ার রোগীর সংখ্যাও বেশি। তবে এটি প্রকৃত অর্থেই জেনেটিক্সের সাথে সম্পর্কিত কিনা তা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অধিকাংশ মনোচিকিৎসক মনে করেন, প্যারানয়ার সাথে জীবন আচরণে নানা মনোশারীরিক চাপ বা স্ট্রেস জড়িত। তারা এসবের সমর্থনে প্রচুর যুক্তিও দেখিয়েছেন। সমীক্ষায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, যারা ইমিগ্রান্ট, কারাবন্দি, যুদ্ধবন্দি এবং সমাজের অন্যান্য স্তরে যারা চরম মনোদৈহিক চাপের শিকার তারাই প্যারানয়া হয়ে পড়েন। কখনো কখনো এ প্যারানয়া চিন্তা-ভাবনা এত বেশি মাত্রায় হয়ে থাকে যে ব্যক্তির কাজকর্ম এবং পারিবারিক জীবনে ও দাম্পত্য জীবনে দারুণ সমস্যায় পড়তে হয়। এ ধরনের লোকদের বলা হয় প্যারানয়েড পার্সোনালিটি।

প্যারানয়াকে প্রধানত ৩টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো: প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, ডিলিউশনাল প্যারানয়েড ডিসঅর্ডার এবং প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়াl

প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ কিছু না কিছু সময়ের জন্য কোনো কোনো রকমের সন্দেহ পোষণ করে থাকে। তাই বলে এ সমস্যাটিকে প্যারানয়া বলা যাবে না। যারা প্যারানয়া বা প্রকৃত অর্থেই সন্দেহবাতিকতায় ভোগেন তারা তাদের দৈনন্দিন কার্যাবলি এবং অন্যান্য আচরণ নিয়েও নানা সব জটিলতা বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। এ ধরনের ব্যক্তিরা অহেতুক বা কোনো কারণ ছাড়াই যে কাউকে সন্দেহ করে থাকে, বা লোকজন সম্পর্কে অহেতুক অবিশ্বাস পোষণ করে থাকে। এই অবিশ্বাস পোষণের মাত্রা কিংবা সন্দেহ পোষণের মাত্রা সাধারণ সীমাকে অতিক্রম করে সাইকোপ্যাথলজি বা রোগের পর্যায়ে চলে যায়। প্যারানয়ার মাত্রা হালকা ধরনের হলে ব্যক্তি সমাজে মোটামুটি খাপ খাইয়ে চলতে পারে। তবে সন্দেহবাতিকতার যখন তীব্র মাত্রায় হয় তখন তার দৈনন্দিন সামাজিক কার্যকলাপ যাবতীয় জীবনযাপন প্রণালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

কিছু কিছু গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে, এ শতাব্দীতে প্যারানয়ার রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তবে স্ট্রেস বা মনোশারীরিক চাপে সন্দেহাতীতভাবে এ মনোবৈকল্যের সাথে পুরোপুরি জড়িত নয়। তাহলে মূল কথা হচ্ছে এই জেনেটিক বা বংশগত উপাদান, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা, মস্তিষ্কে বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণে এ সমস্যা এবং মনোশারীরিক চাপ সবগুলোই এ প্যারানয়া রোগ সৃষ্টি করতে অবদান রাখছে। তবে কারণ যাই হোক প্যারানয়ার ব্যক্তি তার নিজের জীবন এবং পরিবার ও অন্যান্যের জীবন অনেক সময় দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, ফলে এতে করে দেখা দিতে পারে বিভিন্ন অনাকাঙিক্ষত ঘটনা।

সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের মাঝে প্যারানয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। সিজোফ্রেনিয়া এক জটিল মানসিক রোগ। প্রতি ১০০ জনে ১ জন সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত হয়। সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মাঝে আবেগ-অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা ভেতরে ভেতরে তীব্র আবেগ অনুভব করে থাকে। সিজোফ্রেনিয়ার প্রাবল্য যত বাড়তে থাকে রোগীর আবেগহীনতাও তত বাড়তে থাকে। রোগীরা নিজেদের ভেতরের শক্তি হারিয়ে ফেলে। জীবন সম্পর্কে উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেl সিজোফ্রেনিয়ার রোগী তার মানসিক শক্তি এতটাই হারিয়ে ফেলে যে, তারা অনেক সময় শুধুই ঘুমাতে চায়, খাওয়ার সময় অগোছালোভাবে খাওয়া-দাওয়া করে।

সিজোফ্রেনিয়ার রোগী এমন সব কথাবার্তা শুনতে পায় যে, তাকে কোনো কিছুর আদেশ করা হচ্ছে, অথচ আশপাশে কেউ নেই, এরা গায়েবি আওয়াজ শুনতে পায়, এ রোগীরা কানে যা শোনে তা বিশ্বাস করে ও সাথে সাথে তা মানে এবং কোনো অর্ডার শুনলে তা পালনও করে বসতে পারে। কিছু কিছু রোগী আবার প্যারানয়া বা সন্দেহবাতিকতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা সবাইকেই সন্দেহ করে। ঘরে স্ত্রী থেকে শুরু করে পরিবারের সবাইকে এরা সন্দেহ করে। এদের ভ্রান্ত ধারণা জন্মে যে সবাই তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে, তাকে ক্ষতি করার চিন্তা-ভাবনা করছে, প্ল্যান-পরিকল্পনা করছে। ফলে ভ্রান্ত বিশ্বাসের শিকার হয়ে সে পরিবারের লোকজনকে মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলতে পারে, তাই এর চিকিৎসা প্রয়োজন।

-Maq Robinson

Write A Comment

error: Content is protected !!