আজ থেকে ঠিক আটচল্লিশ বছর আগে দিনটি ছিল বুধবার, একাত্তরের ৫ মে……

এদিন নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুরে অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল শতাধিক নিরীহ বাঙালিকে।

১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল নাটোরের ময়না গ্রামে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে ইপিআর, আনসার ও মুক্তিকামী জনগণের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের এক পর্যায়ে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের হাতে ধৃত পাকিস্তানী হার্মাদ মেজর আসলাম এবং ক্যাপ্টেন রাজাসহ মোট তিনজনকে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভিতরে নিয়ে হত্যা করা হয়।

স্মর্তব্য, এই ঘটনার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নাটোর ক্যাম্পের মেজর শেরওয়ানী খানের আশ্বাসে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের তৎকালীন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট (অবঃ) আনোয়ারুল আজিম মিলের উৎপাদন অব্যহত রেখেছিলেন।

 

একাত্তরের মে মাসের ৫ তারিখে আনুমানিক সময় সকাল সাড়ে দশটায় মিলের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী অমানুষদের দল প্রবেশ করে। এসময় মনজুর ইমান নামে এক বিহারি কর্মচারী বাঙালি শ্রমিক,কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দিয়েছিল পাকিস্তানী সেনাদের। অবাঙালিদের মাথায় সাদা রুমাল বেঁধে চিহ্নিত করা হয়েছিল,যেন তাঁদের মেরে ফেলা না হয়।

বাঙালিদের পুরো মিল এলাকা থেকে খুঁজে এনে, ১ নং গেট সংলগ্ন গোপাল সাগর নামের পুকুরটির সামনে জড়ো করা হয়েছিল সেদিন। মিলের প্রশাসক লেফটেন্যান্ট (অবঃ) আনোয়ারুল আজিমকে পাকিস্তানী সেনা অফিসার জিজ্ঞেস করে, ‘মেজর আসলামকে কে মেরেছে?’ প্রতি উত্তরে, ‘জানা নেই’ কথাটি বলার সাথে সাথে উপস্থিত পাকিস্তানী হার্মাদরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে বার্স্টফায়ার শুরু করে। নিমিষেই লুটিয়ে পড়তে থাকেন উপস্থিত নিরীহ বাঙালিরা।

তাঁদের রক্তের ধারায় গোপাল পুকুরের পানি লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করেছিল। সেদিনের নির্মম নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থেকে ৫ থেকে ৭ জন প্রানে বেঁচেছিলেন। তাঁদেরই একজন খন্দকার ভাই, যার আপন ছোট ভাই মান্নানও আছেন শহীদ তালিকায়।

বেদনাদায়ক গণহত্যার দুই বছর পর ১৯৭৩ সালের ৫ মে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের তৎকালীন প্রশাসক শহীদ লেফটেন্যান্ট (অবঃ) আনোয়ারুল আজিমের স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার সেই গোপাল পুকুররের সামনে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। সেদিন থেকে এই পুকুরটি শহীদ সাগর নামে পরিচিত। একইসাথে শহীদ লেফটেন্যান্ট (অবঃ) আনোয়ারুল আজিমের নামানুসারে গোপালপুর রেল স্টেশনের নামকরণ হয়েছে আজিমনগর স্টেশন।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ১৯৩৩ সালে স্থাপিত বাংলাদেশের চিনি শিল্পের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। শুরুর দিকে ব্যাক্তি মালিকানাধীন এই মিলটি সুরুজমাল ও নাগরমাল নামের দুই মাড়োয়ারি ভাইয়ের ছিল। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধের পর মিলটিকে তৎকালীন পাকিস্তানী সেনা একনায়ক আইয়ুব খান এটিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসে।

এটি বাংলাদেশের একমাত্র উৎপাদন কেন্দ্র যার অভ্যন্তরে একাত্তরের শহীদ স্মরণে স্মৃতি যাদুঘর রয়েছে।

গেরিলা ১৯৭১ পরিবার, আজকের বেদনাময় দিনে সকল শহীদদের চিরশান্তি প্রার্থনা করছি।

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ শ্রদ্ধেয় খন্দকার ভাই, যিনি এ গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন। স্মৃতিচারণের মুহূর্তে তাঁর তীব্র কান্না সহ্য করার ক্ষমতা ছিলোনা।

Courtesy; গেরিলা ৭১

Write A Comment

error: Content is protected !!