“যখন কোনো পাকিস্তানী আর্মি দেখবি, একটা করে মাথায় গুলি করবি”,

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, প্রখ্যাত সুরকার-গীতিকার মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে সর্বশেষ এ কথাটিই বলে গিয়েছিলেন কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট কমান্ডার শহীদ নজরুল ইসলাম।২০ নভেম্বর তাঁর ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি আমাদের হৃদয় গভীরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

একাত্তরের ২০শে নভেম্বর ছিল,পরাধীন বাংলার শেষ ঈদ। আর, এদিন রাতেই পাকি নরপশুদের হাতে রচিত হয় অগণিত নির্মম-অমানবিক আখ্যানের আরও একটি। এ রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাবজেল থেকে শহীদ সিরু মিয়া দারোগা ও তাঁর সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার ও শহীদ নজরুল সহ, ৩৮ (মতান্তরে ৪০) জনকে কারাগার থেকে বের করে এনে পৈরতলায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে পাকিস্তানী অমানুষ আর দেশীয় হায়েনা রাজাকাররা।

বলছি শহীদ নজরুল ইসলামের কথা…………

১৯৫১ সালে বৃহত্তর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার উপজেলার সুন্দলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শহীদ নজরুল ইসলাম। তাঁর বাবা আব্দুল আজিজ সরকার এবং মা রাবেয়া খাতুন, দুজন’ই পুত্রশোক হৃদয়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। একমাত্র ছোটবোন কামরুন্নাহার বতুল প্রিয় ভাই হারাবার যন্ত্রণা নিয়ে আজও বেঁচে আছেন।

শহীদ নজরুল ইসলাম ১৯৬৭ সালে টাঙ্গাইলের বিবেকানান্দ আশ্রম হাইস্কুল থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজে পড়াকালীন অবস্থায় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে। একই সময়ে ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদেরও জিএস ছিল।

ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাস করে সেবছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৭১ সালে শহীদ নজরুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।

একাত্তরে ২৫ মার্চ রাতে, ঢাকায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যার সূচনালগ্নে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন, এবং কয়েকদিনের ভেতর ভারতের আগরতলায় পৌঁছান। এখানে উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ তিনি আগরতলা যাওয়ার দিন তাঁর বন্ধু বর্তমানে জার্মান প্রবাসী শ্রদ্ধেয় সৈয়দ আহমেদ সেলিম’দের বাসায় খাবার গ্রহণ করেন। সৈয়দ আহমেদ সেলিমের সাথে তাঁর বন্ধু শহীদ নজরুল ইসলামের এটিই সর্বশেষ সাক্ষাৎ।

আগরতলায় প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং একইসাথে গোপনে ঢাকার ছাত্রদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য আগরতলায় দিয়ে আসতে শুরু করেন। দাউদকান্দিতেও ছাত্র-যুবকদের, ছোট দলে বিভক্ত করে কৌশলে সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে যেতেন। একাত্তরের আগস্টে তিনি দাউদকান্দি থানার বিএলএফ কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন।

২৭ অক্টোবর ১৯৭১ সাল, তখন রোজার মাস সবে শুরু হয়েছে। সেদিন শহীদ নজরুল ইসলাম, ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার দারোগা শহীদ সিরু মিয়া, তাঁর ছেলে শহীদ কামাল সহ ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা স্থানীয় এক রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার তন্তর চেকপোস্টে। তাঁদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে। সেখানে টানা তেইশ দিন শহীদ নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন।

এরপর ২০ নভেম্বর ১৯৭১ সালের রোজার ঈদের দিন দিবাগত রাত ১২টার পর (২১ নভেম্বর) শহীদ নজরুলসহ জেলে বন্দি ৩৮ জন (মতান্তরে ৪০) মুক্তিযোদ্ধাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের পশ্চিমে পৈরতলায়, দাঁড় করিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং পরে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, শহীদ নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর শেষ কথোপকথনের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,” আমি নজরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো পালিয়ে গেলেন না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কিছু বলার নেই রে। এই লুঙ্গিটা আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিস। একটি সিগারেটের টুকরা দেখিয়ে সেটিও দিতে বলেন। আর বলেন, যখন কোন পাকিস্তানী আর্মি দেখবি, একটা করে মাথায় গুলি করবি।”

আমাদের সম্মিলিত অমার্জনীয় বিস্মরণের ফলে স্বাধীন সার্বভৌম দেশে আজ কোথাও নেই শহীদ নজরুল ইসলাম সহ অগণিত মুক্তিযোদ্ধা। দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুরে শহীদ নজরুল কলেজ এবং শহীদনগর থেকে গোয়লামারি পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ ছাড়া কিছুই করা হয়নি। এমনকি তাঁর সংগঠন ছাত্রলীগের কোন আয়োজনেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয়না।

ভুলে যেতে নেই, তাঁদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের সকল আস্ফালন।

(শহীদ নজরুল ইসলামকে উপজীব্য করে লিখতে তাগাদা দিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু সৈয়দ আহমেদ সেলিম, আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি)

Write A Comment

error: Content is protected !!