সারা বিশ্বের প্রতাপশালী রাষ্ট্রগুলির গণবিরোধী কুকীর্তি প্রকাশ করা উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ তার একটা ইন্টারভিউতে তার জীবনকে বদলে দেয়া একটা বইয়ের নাম করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জর্জ অরওয়েলের লেখা ‘নাইনটিন এইটি-ফোর’ পড়েই তার চিন্তা ভাবনা একদম বদলে যায়। সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে পালানো দুই বোন যারা সিঙ্গাপুরে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের একজন জানান, জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি-ফোর বা ১৯৮৪ পড়েই তার চোখ খুলে যায়…।

‘নাইনটিন এইটি-ফোর উপন্যাসে জর্জ অরওয়েল আসলে সব রকম প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। কেমন করে রাষ্ট্র জনগণের প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ করে। মানুষ পরস্পর কি বলছে তা আড়ি পেতে শোনে। ‘রাষ্ট্র বিরোধী’ সব রকম ষড়যন্ত্র রুখে দিতে শত শত ক্যামেরা, প্রযুক্তি প্রতিটি মানুষের পিছনে নজরদারীতে লাগানো হয় ফলশ্রুতিতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু থাকে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা উঠে যায়। হঠাৎ হঠাৎ মানুষ গুম হয়ে যায়। সরকারী বাহিনী এসে ধরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ ফেইসবুকে কিছু লিখতে ভয় পায়। যদি সে গুম হয়ে যায় কিংবা বিশেষ কোন বাহিনী এসে তুলে নিয়ে যায়? চীন ফেইসবুককে ঢুকতে দেয়নি নিয়ন্ত্রণহীন হবার ভয়ে। তার বদলে শতভাগ নজরদারীর জাল বিছিয়ে বিকল্প ফেইসবুক বানিয়ে দেয়া হয়েছে। সৌদি আরবে নারীদের প্রতি নজরদারী করতে অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। আমরা যদি ইউরোপ আমেরিকার মত গণতান্ত্রিক দেশের কথা বলি, সেখানেও জর্জ অরওয়েল প্রাসঙ্গিক তার ১৯৮৪ উপন্যাসের জন্য। আমেরিকার নির্বাচনে ফেইসবুককে দিয়ে জনগণকে বোকা বানানো হয়েছিলো। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের গোপন অ্যালগরিদম দিয়ে জনগণের তথ্য এমনভাব নিয়ন্ত্রণ করে যে তাদের মনে হতে পারে ভারতে কেবল নাগা সন্ন্যাসী আর তান্ত্রিকদের বাস!

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের ক্রীড়ণক হওয়ায় পৃথিবী ছোট হবার বদলে অন্ধের হস্তিদর্শনের মত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিই আবার রাষ্ট্রগুলোর মাথা ব্যথার কারণ। সম্ভবত বিকল্প মিডিয়া বলতে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটের অন্যান্য সুবিধা- রাষ্ট্র ধারণায় আগামীতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে। প্রথম আঘাতটা আসবে প্রতিক্রিয়াশীল সমস্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। যেমন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, ইসলামিক শরীয়া শাসিত রাষ্ট্র। জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ পড়লে আপনি সেখানে ইচ্ছা করলে একটা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কিংবা একটা ইসলামিক রাষ্ট্র কল্পনা করে নিতে পারেন। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে যখন এই বইটি আমি পড়ি তখন আমার সন্দেহ হতে থাকে লেখক নিশ্চয় কমিউনিস্ট বিরোধী। আমার বইটি অপছন্দ হতে থাকে কারণ তখন পর্যন্ত আমি বামঘেষা ছিলাম। আজ এই বইটি পড়লে আপনি বাংলাদেশকেও কল্পনা করতে পারেন…।

রাষ্ট্র দাবী করে ‘ভুয়া খবর’ এখন তাদের জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। অথচ দেখা গেছে বাস্তবে রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাশীন ব্যক্তিবর্গই এইসব ভুয়া খবর তৈরি করে ছড়িয়ে দেন। কাজেই ‘ভুয়া খবর’ ও ভুয়া সংবাদমাধ্যমকে বিকল্প মিডিয়ার সামনে জবাবদেহী করার মাধ্যমেই আসবে সঠিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের পর্যবেক্ষণ। আপনাকে মাথা খাটাতে হবে। কোন কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন না করে যুক্তি তর্কের মাধ্যমে বিশ্বকে বুঝে নিতে হবে। নইলে ‘অ্যালগরিদম’ আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে। সৌদি নারীদের বিদ্রোহ সম্ভব হয়েছে কারণ তাদের ছিলো বিকল্প মিডিয়া। সৌদি মিডিয়া তাদের আজন্ম বুঝিয়েছে ও জানিয়েছে পৃথিবীর সব নারী আর তাদের জীবন অভিন্ন কিছু নয়। ইরানী নারীদের এই প্রজন্ম ৪০ বছর আগের ইরানের কথা জানে না। ইরানের ইসলামিক সরকার সেই ইতিহাস তাদের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে রেখে ভিন্ন দেশপ্রেম শিখিয়েছে যাতে তারা ইসলামিক রিপারলিক নিয়েই গর্ব করতে পারে। কিন্তু একটা সার্চ ইঞ্জিন তাদের ৪০ বছর আগের ইরানী স্বাধীন নারীদের সন্ধান দিয়েছে। যে নারীবাদ ইরানে নিষিদ্ধ সেটাই নেট দুনিয়াতে অবাধ। আর এসব কারণেই রাষ্ট্রগুলো কড়া নজরদারী শুরু করে দিয়েছে এইসব মাধ্যমগুলোর প্রতি। নির্বাচনের আগে ফেইসবুক টুইটার বন্ধ, লাইভ সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। এবং এগুলো যে কতটা দরকার সেটি আমাদের বুঝানো হয় সেই ‘অ্যালগরিদম’ কাজে লাগিয়ে তথ্যকে নির্বাচিত করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।

আমরা ক্রমশ নৈরাজ্যবাদী (রাষ্ট্রবিরোধী) হয়ে উঠব। রাষ্ট্র একদিন উঠে যাবে। সেটা জোর করে নয়। সময়ের হাত ধরে সভ্যতার একটা পর্যায়ে এসে যখন মানুষের সমাজ কেবল থাকবে। কাজেই নতুন করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন মানেই পায়ে শেকল পড়ানোর গোপন অভিসন্ধি। একমাত্র অমুক রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পারে মানুষকে মুক্তি দিতে- এরকম যত আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে তাকে রক্ষা করতে, সেই আদর্শককে রক্ষা করতে ঐ রাষ্ট্রগুলো প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠবে। আড়ি পাতবে। গোপন অ্যালগরিদম দিয়ে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। গুম, খুন, সেন্সরশীপ চলবে অনুভূতি, স্বাধীনতা সর্বভৌমত্ব রাক্ষার তাগিদে। একটা উদাহরণ দেই, ইসলামিক আন্দোলনের একজন কর্মী তার পড়াশোনা থেকে আমাকে বলেছে, মানব রচিত আইন ও সংবিধান দিয়ে পৃথিবী কোন দেশই আজ শান্তিতে নেই। আমেরিকায় প্রতি সেকেন্ডে চারজন ধর্ষণের শিকার হয়… ইত্যাদি। তার তথ্য কিন্তু নিয়ন্ত্রিত তাদের ইসলামিক ওয়েব সাইট, পেইজ, বই ম্যাগাজিন দিয়ে। সে জানেই না নেদারল্যান্ডে অপরাধীর অভাবে জেলখানাগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আমাদের কাছে এই নিউজ অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। আর সে জানেই না! এগুলোকে আমরা এক ধরণের ‘অ্যালগরিদম’ ব্যবহার বলতে পারি?

তাই আমাদের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। মানুষকে সত্য জানাতে আর ঘটনার সঠিক বিশ্লেষণ পৌঁছে দিতে। আছে রাষ্ট্রের গুম খুন আর বিশেষ বাহিনীর ভয়। আছে প্রযুক্তি কোম্পানির ‘অ্যালগরিদম’ ও কর্পোরেট স্বার্থ, সঙ্গে রাষ্ট্রের গোপন আঁতাত ও রক্তচক্ষু। সব মিলিয়ে জর্জ অরওয়েল আমাদের সময়ে আজো প্রাসঙ্গিক। একজন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেন আর অগণিত নাম না জানা অপ্রকাশিত মানুষ যারা তাদের পায়ের অদৃশ্য শেকলটাকে দেখতে পেয়েছেন, আশা রাখতে পারি, তারা সকলে একসঙ্গে জ্বলে উঠলে পৃথিবী অনেকটা বদলে যাবে। ছোট্ট একটা ওয়েব সাইট উইকিলিকস কেমন ধাক্কাটা দিয়েছিলো ভাবা যায়!

জর্জ অরওয়েল

Write A Comment

error: Content is protected !!