নিমন্ত্রণ পেয়ে সেদিন ঢাকার একটি ফাইভ স্টার হোটেলে গেলাম। সঙ্গে চেনা-অচেনা অনেকে। রাত প্রায় ন’টা। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পানাহারের আয়োজন। কেউ জুস, কেউ কফি, কেউ চা আর কেউ মদ খাচ্ছে। স্যরি, মদ খাচ্ছে না, ড্রিংক করছে। মদ খাওয়া আর ড্রিংক করার মধ্যে ফারাক কোথায়―সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। রাত সাড়ে দশটার দিকে এক বন্ধু বললেন, ‘চলেন, আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় যাই।’ আজন্মের কৌতুহলী আমি চললাম তার সঙ্গে। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন বিশাল একটা হলের গেটে। ভেতরে নৃত্যগীত চলছে। ড্রামের শব্দ কানে আসছে। ভেতরে ঢুকতে গেলে তিন হাজার টাকার টিকেট কাটতে হবে। বন্ধু সেকথা জানেন, তবু তিনি টিকেট ছাড়াই ঢুকে যেতে চাইলেন। যথারীতি প্রহরী তাকে বাধা দিল।

আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম দরজায়। পাশেই ওয়াশরুম। ওয়াশরুম থেকে এক তরুণী এলেন। অপূর্ব সুন্দরী। পরনে শর্ট ড্রেস। এলিটদের ভাষায় তিনি এন্টারটেইনার, সাহিত্যের ভাষায় আনন্দদায়িনী। নৃত্যশিল্পীও বলা যায়। তো এক আনন্দদায়িনী এলেন ওয়াশরুম থেকে। তিনি দরজা দিয়ে হলরুমে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় বন্ধুটি বলে উঠলেন, ‘হাই!’ আনন্দদায়িনীও হাত নাড়িয়ে ‘হাই’ জানালেন এবং বললেন, ‘ভেতরে আসুন।’ বন্ধু বললেন, ‘না, এখন যাব না। কী নাম তোমার?’ আনন্দদায়িনী তার নামটি বললেন। আমরা যেহেতু ভেতরে ঢুকব না, তাই আনন্দদায়িনী দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন আনন্দদায়িনী এলেন ওয়াশরুম থেকে। বন্ধুটি যথারীতি ‘হাই’ দিলেন এবং হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘কী নাম তোমার?’ যাবে আমাদের সঙ্গে?’ আগের আনন্দদায়িনীর মতো এই আনন্দদায়িনীও বললেন, ‘আগে তো ভেতরে আসুন।’ বলেই তিনি ভেতরে ঢুকে পড়লেন।

আমরা বেশ খানিকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বন্ধুটি আমাকে এই ফাইভ স্টার হোটেলের আনন্দদায়িনীদের সম্পর্কে নানা তথ্য জানাচ্ছেন। কীভাবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, কত টাকার বিনিময়ে তাদেরকে বাসায় নিয়ে যাওয়া যায়, ঢাকা শহরের কোন কোন হোটেলে এমন নৃত্যগীতের আসর বসে, কোন হোটেলের রেট কত, কোন হোটেলের আনন্দদায়িনীরা কত সুন্দরী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কান পেতে শুনছি। এক পর্যায়ে বন্ধুটি বললেন, ‘চলুন, ভেতরে ঢুকি। এই জগত সম্পর্কে কিছুই তো জানেন না, লিখবেনটা কী?’ আমি বললাম, ‘আমার কাছে এই মুহূর্তে তিন হাজার টাকা নাই। তাছাড়া অনেক রাত হয়ে গেছে। বাসায় যেতে হবে। আমার স্ত্রী আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’ বন্ধু বললেন, ‘তবে চলুন, আমরা খেয়ে নিই।’ আমরা বেরিয়ে এলাম। পানাহার করে আমি বেরিয়ে পড়লাম। রাত প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে বাসায় ফিরলাম।

দুই.
প্রায় ছয় বছর আগে একটা ল্যাপটপ কিনতে গিয়েছিলাম ঢাকার বিখ্যাত এক কম্পিউটার মার্কেটে। পরিচয় হলো সেলস সেন্টারের প্রধান ব্যবস্থাপকের সঙ্গে। ধরা যাক তার নাম প্রদীপ। কথায় কথায় জানা গেল যে, প্রদীপ পড়ুয়া মানুষ। সাহিত্যের পাঠক। নাম বলতেই আমাকে চিনতে পারলেন এবং বললেন, ‘আমি আপনার রাজনটী উপন্যাসটি পড়েছি। আমি খানিকটা পুলকিত হলাম। এই চান্সে ল্যাপটপের দামটা যদি একটু কমানো যায়! সত্যি সত্যি তিনি কমিয়ে দিলেন। দুই হাজার টাকা ছাড় দিলেন। আমি তো খুশিতে গদগদ। তিনি আমার জন্য কফির অর্ডার দিলেন। দুই কাপ কফি এল। খেতে খেতে বললেন, ‘রাজনটী তো আড়াই শ বছর আগের এক বাইজির কাহিনি। আধুনিক বাইজিদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখুন না। আধুনিক বাইজিদের সম্পর্কে কি আপনার ধরণা আছে?’ আমার সরল স্বীকারোক্তি, ‘না, তেমন কোনো ধারণা নেই।’ তিনি বললেন, ‘জানতে ইচ্ছুক?’ বললাম, ‘নিশ্চয়ই। লেখকদের সব কিছু সম্পর্কে সামান্য হলেও ধারণা থাকতে হয়।’ তিনি তার একটা ভিজিটিং কার্ড আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এই কোম্পানিতে আমার শেয়ার আছে। আমি আসলে ম্যানেজিং ডিরেক্টর। আমার বাসা গুলশানে। আপনাকে আমি একদিন আধুনিক বাইজিখানায় নিয়ে যেতে চাই। লেখার অনেক রসদ পাবেন। লিখতে পারবেন আধুনিক রাজনটী।’ বলেই তিনি অট্টহাসি দিলেন। আমিও হাসলাম।

কিন্তু আধুনিক বাইজিখানা কী? জানতে চাইলাম তার কাছে। তিনি সংক্ষেপে আমাকে আধুনিক বাইজিখানার বর্ণনা দিলেন। পরবর্তী সময়ে আমিও ব্যক্তিগত অনুসন্ধান করে নানা সূত্র থেকে এ সম্পর্কে যৎসামান্য জ্ঞান লাভ করি। গুলশান-বনানী-উত্তরা এলকার বিভিন্ন বারে, হোটেলে এবং ক্লাবে এক ধরনের নৃত্যগীতের আসর হয়ে থাকে। যারা করেন তাদেরকে বলা হয় ‘ডি-জে’ বা ‘ডিস্ক জকি’। বিভিন্ন পার্টিতে গানের মিক্সিং করে তার তালে তালে অতিথিদের মনমাতানোর কাজটি করেন একজন ডিজে। পুরুষদের পাশাপাশি অনেক নারী পেশাদার ডিজে হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ডিজে হিসেবে মনে করা হয় যাকে তার নাম সুলতানা রাজিয়া সুমি। পরবর্তীকালে আরো অনেকে মেয়ে এই পেশায় এসেছেন। মি. প্রদীপ এই ডি-জেদেরকেই আধুনিক বাইজি বলতে চাচ্ছেন। আমি এখনো নিশ্চিত নই এদেরকে আধুনিক বাইজি বলা যাবে কিনা। পরবর্তী সময়ে ‘সেলে’ বারে আমি এই ডি-জেদের দেখা পাই এবং কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিই।

ডি-জে’র কথা গেল। এবার আসি কলগার্লদের প্রসঙ্গে। কলগার্লদের বাংলায় কী বলা যায়? এনজিওদের ভাষায় তারা যৌনকর্মী, শিল্প-সাহিত্যের ভাষায় বারবণিতা, বারাঙ্গনা বা বারবিলাসিনী এবং দেশের সাধারণ মানুষের ভাষায় বেশ্যা বা পতিতা। আমি কোন শব্দটি ব্যবহার করব? আমি কোন শ্রেণির প্রতিনিধি? ঠিক জানি না। যেহেতু আমি সাহিত্যকর্মী, সেহেতু বারাঙ্গনা বা বারবিলাসিনী বা বারবণিতা ব্যবহার করতে পারি। বারাঙ্গনা শ্রুতিমধুর―এটি ব্যবহার করা যায়। ঢাকা শহরের বারাঙ্গনাদের একটা বিশাল চেইন আছে। মেয়েটিকে আপনি বাসায় কল করবেন, যৌনসেবা দিতে মেয়েটি আপনার বাসায় হাজির হবে। এছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে মিনি যৌনালয় রয়েছে, যেখানে গিয়ে ১৫০০/২০০০ টাকার বিনিময়ে যৌনসেবা লাভ করা যায়। এসব মিনি যৌনালয় সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খুব কমই জানে। জানলেও সমস্যা নেই। মাস শেষে থানায় চলে যায় মাসোয়ারা। মাসোয়ারা নিয়মিত পেলে পুলিশ আর ডিস্টার্ব করে না। ডিস্টার্ব করাটা পুলিশের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কিনা আমার ঠিক জানা নেই।

শুধু কলগার্ল নয়, আছে কলবয়রাও। তাদেরকে বলা হয় ‘জিগোলো।’ অর্থাৎ পুরুষ এন্টারটেইনার বা পুরুষ যৌনকর্মী বা পুরুষ সেক্সওয়ার্কার। তাদের কী কাজ? কাজ হচ্ছে, টাকার বিনিময়ে ২৫ থেকে ৪০ বছরের হাইপ্রোফাইল সুন্দরী নারীদেরকে সঙ্গ দেওয়া, তাদের সঙ্গে পার্টি করা, ভ্রমণ করা এবং যৌনসেবা দেওয়া। আমাদের দেশে এই পেশায় যোগদানের জন্য মাধ্যম হিসেবে রয়েছে ইন্টারনেট তথা বিভিন্ন ধরনের সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট। সংবাদপত্রে সাধারণত ফ্রেন্ডশিপ ক্লাব নামে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। কোথাও আবার উল্লেখ থাকে এসকর্ট সার্ভিসের কথাও। আর তাতে নমুনা হিসেবে থাকে এক শ শতাংশ সুন্দরী হাইপ্রোফাইল মহিলা মেম্বারশিপ ক্লাবের কথাও। বিশ্বায়নে এই যুগে এখন বাংলাদেশের জিগোলোদের বিদেশি কোনও মহিলার সঙ্গে বেড়ানো অথবা পার্টি করারও সুযোগ মিলছে এবং ওই বেড়ানোর সময় অথবা পার্টি শেষে বিদেশি ওই নারীর সঙ্গে বোল্ড রিলেশনের মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগও রয়েছে।

জিগোলোদের সেবা বা সার্ভিস যেসব নারী নিয়ে থাকেন তারা কারা? তারা হচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের নারী। সেক্স অ্যাডভেঞ্চার এবং একাকিত্ব দূর করতেই জিগোলোদের ডাক পড়ে। এমন বহু নারী আছেন যারা জিগোলোদের বেডরুমে ডেকে সারা রাত শুধু গল্প করেই কাটিয়ে দেন। আবার এমন অনেক নারী আছেন যাদের যৌনচাহিদা অনেক সময় অত্যাচারের পর্যায়ে চলে যায়। সিগারেটের ছ্যাঁকা থেকে শুরু করে যৌনক্রিয়ার সময় নানারকম অস্বাভাবিক পজিশন―কিছুই বাদ যায় না। তাই জিগোলো হওয়া মানেই সেক্স উইথ ইনকাম নয়, এটি একটি কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশাও বটে। পুলিশের নজর এড়িয়ে শহরের বুকে এসব কীভাবে চলছে? লাল রুমালের সিগন্যাল, কোড ওয়ার্ড―এসব পুলিশের জানা। কিন্তু পুরুষ যৌনকর্মী নিয়ে তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পুলিশ পায় না। তা ছাড়াও পুরুষ যৌনকর্মী বিষয়টি আজও বাংলাদেশে অনেকটাই আরব্য রজনীর গল্পের মতো। তাই বিষয়টি নিয়ে পুলিশ খুব একটা উৎসাহী হয় না।

তিন.
উপরে ডি-জে, কলগার্ল বা বারাঙ্গনা, কলবয় বা পুরুষ যৌনকর্মীদের সম্পর্কে বললাম। এবার আসি জুয়া খেলা সম্পর্কে। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে জুয়ার আসর বসে। জুয়া খেলা ভালো না খারাপ সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। ক্লাবগুলোর নামও বললাম না। ক্লাবের মানহানির অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে আবার মামলা হয়ে যেতে পারে। জুয়ার পাশাপাশি ইনডোর গেম―যেমন, কার্ড, ডাইস ও হাউজি খেলা, কেসিনো ইত্যাদিও চলে; যদিও সম্প্রতি এসব ক্লাবে জুয়ার আসর বন্ধে রুল জারি করেছে উচ্চ আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতের রুলে কি কাজ হবে? মোটেই না। জুয়া প্রাচীন করবার। শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে চলবেই। রাজনৈতিক নেতারা (মূলত ক্যাডার) একে বন্ধ হতে দেবেন না। এক রাতে হাজার হাজার টাকার কামাই কি আর হাতছাড়া করা যায়? বিভিন্ন ক্লাব ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রামের পাড়া-মহল্লায় চলছে জমজমাট জুয়ার আসর। তিন তাস, কাইট, হাজারী, কেরামসহ বিভিন্ন আইটেমের জুয়ার আসরে লাখ লাখ টাকার কারবার চলছে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনের অফিস, সমিতির অফিস, মার্কেট ও দোকান ঘরে এসব আসর বসে। কয়েক বছর আগে এক সিনিয়র কবিবন্ধুর সঙ্গে ধানমণ্ডির এক ক্লাবে গিয়ে দেখেছি মানুষ কীভাবে জুয়া খেলায় লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে, লাখ লাখ টাকা কামাই করছে।

অর্থাৎ শহরে মদ খাওয়ার জন্য লাইসেন্সধারী বার আছে, আনন্দ-ফূর্তি করার জন্য আলীশান সব ফাইভ স্টার হোটেল আছে, সেসব হোটেলের কাস্টমারদের আনন্দদানের জন্য এন্টারটেইনার বা আনন্দদায়িনীরা আছে, বিভিন্ন হোটেল ও ক্লাবে আছে ডি-জেরা, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে আছে কলগার্ল বা যৌনকর্মী বা বারাঙ্গনারা, আছে কলবয় বা জিগোলোরা। কিন্তু মফস্বল শহরে বা গ্রামে কি এসব আছে? মফস্বল শহরে বা গ্রামে কি এখন এসবের কথা চিন্তা করা যায়? যায় না। তার মানে কি গ্রামে আগে এসব ছিল না? ছিল কি ছিল না, তা লিখব পরবর্তী অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ে লিখলাম শহরের কথা। পরবর্তী অধ্যায়ে লিখব গ্রামের কথা। নিচে একটা শিরোনামও দিয়ে রাখলাম। পরববর্তী সময়ে এই শিরোনাম পরিবর্তনও হতে পারে।

শহর ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বৈষম্য : লাভ-ক্ষতি ॥ পর্ব-১
স্বকৃত নোমান। ঢাকা, ২০.১১.২০১৮

Write A Comment

error: Content is protected !!