বর্তমান বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার দারিয়ালা গ্রামে ১৯৫৩ সালের পহেলা আগস্ট আমার জন্ম। আমাদের বসতিটা আঠারোবাঁকি নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত। অজ-পাড়াগাঁয়ের কৃষিভিত্তিক অশিক্ষিত পরিবারে বেড়ে উঠা আমার শৈশব-স্মৃতি। তবে অনেক পালা পার্বণের ভেতর দিয়ে আনন্দেই কেটেছে শৈশব। লেখাপড়া জানা না থাকলে ও বাবা ছিলেন অনেক অসাম্প্রদায়িক। বাবার বহু হিন্দু বন্ধু ছিল। তাদের সব পূঁজায় বাবা নিমন্ত্রণ পেতেন এবং বেশিরভাগ জায়গায় আমাকে পাঠাতেন। বাবা মোটেই ধার্মিক ছিলেন না এবং ছোট বেলায় কখনোই ধর্ম চর্চার কথা বলতেন না। অগ্রহায়ণ মাসে ফসলাদী ঘরে তোলার পর পালা গান, জারি গান, যাত্রা, লাঠি খেলে, ঢালী খেলা, ঘোড়দৌড় সহ নানা ধরণের বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। লাঠি খেলা, ঢালী খেলায় আমি নিজে অংশগ্রহণ করেছি। আমার বাবা চাচারা ৫ ভাই। তাদের কোনো ছেলে মেয়েরা যেহেতু স্কুলে যেতো না তাই আমার বেলায় ও কোন তাড়া ছিল না। আমার মা হটাৎ করে একদিন আবিষ্কার করলেন যে আমি ঘরের মাচায় উঠে ধান চাল রাখার সব মাটির পাত্রে কাঠ পোড়ানো কয়লা দিয়ে কীসব আঁকা-ঝুঁকা করেছি। আমার এটা দেখানোর জন্য ডেকে আনলেন আমার বাবার এক চাচাতো ভাইকে যিনি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি দেখে আমাকে স্কুলে পাঠানোর সুপারিশ করলেন। বাবা বেঁকে বসলেন। আমার বড়ো দুই বোন মারা যাবার পর আমার বাবা জন্মের আগেই মানত করেছিলেন ছেলে হলে মাদ্রাসায় পড়াবেন। আমার স্কুল শিক্ষক চাচা বহু কষ্টে বাবাকে রাজী করালেন আমাকে যেন আমার বাবা পঞ্চম শ্রেণী পাস্ করা পর্যন্ত স্কুলে পড়ার অনুমতি দেন। বাবা রাজী হলেন। এভাবে আমার স্কুল জীবন শুরু।

 স্কুলে ভর্তি হওয়াটা আমার জীবনের একটা মাইলফলক। লেখাপড়া জানা পরিবারে স্কুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু আমার জন্য ছিল একটা উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা। আমিই হচ্ছি আমাদের বিশাল পরিবারের একমাত্র স্কুলগামী বালক। এই স্বাতন্ত্রবোধ থেকে মন দিয়ে পড়তাম, নিজে থেকেই। পড়ালেখা করার জন্য যেমন তাড়া দেওয়ার কেউ ছিল না তেমন পড়ালেখায় সাহায্য করারও কেউ ছিল না। প্রথম শ্রেণীর প্রথম পরীক্ষায় বিশাল নম্বরের ব্যাবধানে প্রথম স্থান অধিকার করলাম। আশেপাশের অনেক শিক্ষিত পরিবারের ছাত্র ও অভিভাবকদের চোখ বড় হয়ে গেলো। এরপর আমি পড়লাম অন্য সমস্যায়। একবার যখন প্রথমস্থান অধিকার করেছি তাতো আর ছাড়া যায় না। এটা আমাকে একটা বাড়তি চাপের ভেতর ফেললো। এই বাড়তি চাপের কারণেই হয়তো পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত কখনোই দ্বিতীয় হই নাই।

 পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার বাইরে এমন একটা অভিজ্ঞতা হয় যা আমার সামনের পুরো জীবনটাকেই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় একবার একা লঞ্চে করে খুলনাতে বেড়াতে যাই আমায় মেঝো খালার বাসায়। হঠাৎ করে লঞ্চের ইঞ্জিন রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখ আটকে যায় ইঞ্জিনের উপর। খুলনা পৌঁছানোর আগে প্রায় ঘন্টা তিনেক ইঞ্জিনের পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম ইঞ্জিন কিভাবে কাজ করে। তেমন কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু কৌতুহলটা উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকলো। সেকারণে দিন দশেকের ভিতর আবারও খুলনা গেলাম মূলত লঞ্চের ইঞ্জিন দেখার জন্য। এবার ইঞ্জিনচালক আমাকে সনাক্ত করলেন যে ক’দিন আগেও এভাবে আমি ইঞ্জিনের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। তিনি আমার কুশলাদী জিজ্ঞাসা করাতে সাহস পেয়ে প্রশ্ন করলাম এই ইঞ্জিন কারা বানায়। ইঞ্জিন চালক শুধু বললেন ইঞ্জিনিয়াররা বানায়। এভাবে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অনেকবার এই ইঞ্জিন দেখার নেশায় লঞ্চে করে খুলনায় গিয়েছি। এরপর আমাকে খুব যত্ন করে ইঞ্জিনের পাশে বসার ব্যাবস্থা করে দিতেন সেই ইঞ্জিনচালক। একবার কৌতুলবশে প্রশ্ন করলাম, ‘এই ইঞ্জিন কোন ইঞ্জিনিয়াররা বানায়?’ ইঞ্জিনচালক বললেন, ‘মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা বানায়I’ সেই মুহূর্তে ঠিক করে ফেললাম আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হব।

 ছাত্রজীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতে অসম্ভব সব বাঁধার মোকাবিলা করেছি। কিন্তু এক মুহূর্তও আমি লক্ষ্যচ্যুত হই নাই। আমার বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্কুল শিক্ষা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম। বাবার সাথে আমার স্কুল শিক্ষক চাচার সমঝোতা ছিল আমাকে যেন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর কথামত বাবা আমাকে কওমি মাদ্রাসায় যেতে বললেন। আবার গিয়ে ধরলাম আমার চাচাকে। এখন আমার ভয় স্কুলে না পড়লে তো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবো না। আমার বাবাকে অনেক বুঝিয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে যেতে অনুমতি পেলাম।গ্রামের হাইস্কুলেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। এই হাইস্কুলের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও বাইরে থেকে আরো তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ভর্তি হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। আমি এসেছিলাম নতুন প্রতিষ্ঠিত অখ্যাত একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এই পরিস্থিতিতে আমার মাথায় একটা চিন্তাই কাজ করছিলো। তা হলো এতদিন তো ক্লাসে প্রথম হয়ে এসেছি। এবার এতগুলো ভালো স্কুলের ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে কিভাবে পরীক্ষায় প্রথম স্থানটা ধরে রাখবো। হাইস্কুলের শিক্ষকদের সাথে পূর্ব পরিচয় ছিল না। ষষ্ঠ শ্রেণীর প্রথম পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রত্যেক বিষয়ের শিক্ষকরা ক্লাসে এসে প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ছাত্রদের নাম ডাকা শুরু করলেন। এত প্রতিযোগিতার ভেতরও সব বিষয়ে আমার নামই প্রথমে ডাকা হয়েছিল। আমি নিজেও এতটা আশা করি নাই। ফলাফলের একই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে অষ্টম শ্রেণী শেষ করলাম এই হাইস্কুল থেকে। আমার বাবা যাই বলুক না কেন আমি তখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই প্রচলিত স্কুল শিক্ষা চালিয়ে যেতে। এখন আমার শক্ত অবস্থানের কারণ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হবার অদম্য বাসনা। কিন্তু সমস্যা হলো গ্রামের স্কুলে নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না তখন। আমার চাচা বাবার সাথে কোন আলাপ না করে আমাকে বাড়ি ছেড়ে খুলনায় গিয়ে কোন ভালো স্কুলে ভর্তি হতে বললেন যেখানে বিজ্ঞান বিভাগ আছে। উপায়ন্তর না দেখে আপাতত গ্রামের হাইস্কুলেই নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। চাচা খুলনায় যেতে বললেও তিনি আমাকে কোন সরাসরি সাহায্যে আসতে চাইলেন না আমার বাবার ভয়ে। আমার তখন সবথেকে বড় দুঃশ্চিন্তা আর বুঝি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলাম না।

 ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে আসা যাওয়ার লঞ্চ ভাড়া জোগাড় করে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম যদি কোন ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারি। খুলনার স্কুলগুলো সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। আমাদের গ্রামের কিছু ছাত্র খুলনার বিভিন্ন কলেজে পড়তো। তাদের তিনজনকে পেলাম লঞ্চে। তাদের কাছে জানতে চাইলাম খুলনার সব থেকে ভালো স্কুলের নাম। তারা জানালো সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলের নাম। সেটাই নাকি খুলনার সেরা স্কুল। কেন সেরা স্কুলের নাম জানতে চাচ্ছি সেটার উত্তরে যখন বললাম আমি সেখানে ভর্তি হতে চাই, তখন তিনজনই শব্দ করে হাসা শুরু করলো। তারা বললো এসব স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য হাজার হাজার ছাত্র ডিসেম্বর মাসে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি সেসব স্কুলে ভর্তির চিন্তা করছি এটাই তাদের হাসির কারণ। তাদের হাসি আমাকে দমাতে পারলো না।লঞ্চ থেকে নেমে লোকদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে সকাল এগারোটা নাগাদ সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলের বিশাল গেটের সামনে হাজির। শুনশান নীরবতা। ক্লাস চলছে বলে একটা ছাত্রও বাইরে নাই। গেটের সামনে একা আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক বিদেশি ভদ্রলোক এগিয়ে আসলেন আমার কাছে। এটা রোমান ক্যাথলিকদের পরিচালিত একটি স্কুল। আমাকে ভাঙা বাংলায় প্রশ্ন করলেন, ‘কি চাও?’ তিনি ভীষণ অবাক হলেন যখন বললাম আমি এখানে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হতে এসেছি। তিনি আরও জানতে চাইলেন বিশেষভাবে এই স্কুল কেন বেছে নিলাম। লঞ্চের তিনজন কলেজ ছাত্রের কথা বললাম যারা আমাকে বলেছে সেন্ট জোসেফস স্কুলই খুলনার সেরা স্কুল। লোহার গেটের দুইপাশে দাঁড়িয়েই এতক্ষণ আলাপ চলছিল। তিনি সেই কলেজ ছাত্রদের মত করেই বললেন যে ভর্তি পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসেই শেষ। তিনি আরও জানালেন যে, এই বছর অষ্টম শ্রেণী থেকে এত বেশী ছাত্র রয়ে গেছে যে বাইরে থেকে নবম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগে কোন ছাত্র নেওয়া হয় নাই। এসব শুনে কিছুটা হতাশ হয়ে আমি শুধু বললাম, ‘আমি এত কিছু তো জানি না। আমি শুধু জানি বিজ্ঞান বিভাগে না পড়লে আমার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া হবে না। আমি যেখানে অষ্টম শ্রেণীতে পড়েছি সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ নাই।’ আমার কথা শুনে মিনিট খানেক তাকিয়ে থেকে নিজেই গেট খুলে দিলেন। তখনও তাঁর পরিচয় জানি না। আমাকে তাঁর অফিসে নিয়ে পরিচয় দিলেন তিনিই এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ জি ব্রুনো। আমার অষ্টম শ্রেণীর মার্কশিট দেখে জানতে চাইলেন, ‘তোমার কাছে কি ভর্তির টাকা আছে?’ তাঁর প্রশ্নটা বুঝতে আমার একটু সময় লেগেছিল। এটা ছিল শুক্রবার। কাছে টাকা নাই শুনে আমাকে সময় দিলেন সোমবার টাকাসহ ভর্তির জন্য তাঁর সাথে দেখা করতে। লঞ্চে করে বাড়ি ফেরার পথে সকালে দেখা হওয়া ছাত্রদের সাথে আবার দেখা। ওরা তামাশা করে জানতে চাইলো আমি ভর্তি হয়েছি কিনা। ওরা কোনো ভাবেই বিশ্বাস করতে চায় না যে আমি ভর্তির টাকা আনতে বাড়িতে যাচ্ছি। এ জি ব্রুনোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার স্বপ্ন পূরণে সব থেকে বড় সহায়তাকারী তিনি, আমার জীবনের অন্যতম সেরা শিক্ষকও তিনি।

কথা মত সোমবার খুলনায় গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম। এবার বাবাকে বুঝাতে কষ্ট হলো না যে আমি মাদ্রাসায় পড়তে চাই না। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে গিয়েও সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলে ভর্তির মত অসাধ্য সাধনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এ চিন্তা মাথায় আসে নাই যে খুলনায় থাকবো কোথায়। স্কুল চালু তখন। সেদিন থেকেই ক্লাস শুরু করলাম। রাতে কোথায় থাকবো তার জায়গার ঠিক নাই। এই স্কুলে ২৪ জন খ্রিস্টান ছাত্রের জন্য ৪ তলা একটা হোস্টেল প্রায় খালিই পড়ে থাকে। এরকম বয়সে এখানে পড়তে আসার সিদ্ধান্তটা অনেকটা সাঁতার না জেনে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার মত মনে হচ্ছিলো।স্কুল থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে রূপসা নদীর উত্তর পাড়ে বেলফুলিয়াতে আবুল কালাম আজাদ নামে গ্রাম সম্পর্কের এক চাচা ছিলেন। তিনি তখন খুলনার এক কলেজে বিএ পড়েন। তিনি নিজেই লজিং মাস্টার হিসেবে ছাত্র পড়িয়ে সেখানে থাকতেন। থাকার জায়গার কোন ব্যবস্থা না করে এভাবে স্কুলে ভর্তির জন্য অনেক বকাঝকা করলেন। তারপরও তিনদিনের জন্য থাকতে দিলেন আমাকে। এর ভেতর বেলফুলিয়ার বিভিন্ন বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকা আমাদের এলাকার ছাত্ররা মিলে আমার জন্য একটা থাকার জায়গা খুঁজতে শুরু করে। আমি কিন্তু এই অবস্থায়ও ক্লাসে হাজির হচ্ছি। তিনদিনের ভেতরই স্কুল থেকে প্রায় ৪ মাইল দূরে বেলফুলিয়ায় আমার একটা থাকার জায়গা জুটলো যেখানে আমাকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর দুইটা মেয়েকে পড়াতে হত। প্রতিদিন এই ৪ মাইল পথ পায়ে হেঁটে নিয়মিত সময়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। চমৎকার থাকা জায়গা।

 একতলা বিল্ডিংয়ে আমার একটা থাকার রুম ছিল। সামনে বেশ বড় পুকুর। প্রচুর মাছ ছিল পুকুরে। আমি মাঝে মাঝে সেই মাছ ধরায় অংশ নিতাম। এত কিছুর পরও বাড়ির জন্য মন খারাপ হত। স্কুলে দুপুরে দেওয়া তিনটে বিস্কুটের লাঞ্চ খেয়ে ছুটির পর প্রতিদিন ৪ মাইল পায়ে হাঁটা খুবই কষ্টকর ছিল। আমার পরিচিত সবাইকে ব্যাপারটা বললাম। তারা সবাই মিলে খুঁজে আবার একটা থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে দিলো যা স্কুল থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে। কিন্তু এখানে থাকা শুরু করেই বুঝলাম বড় ভুল হয়ে গেছে। প্রথম জায়গাটাই ভালো ছিল। এভাবে বেশ কয়েকবার জায়গা বদলের পর স্কুলের পাশে এক স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের বাড়িতে জায়গা হল তার দুই মেয়েকে পড়ানোর শর্তে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া এমন অসভ্য ছাত্রী আমি জীবনেও দেখি নাই। কিন্তু তাদের মা শুরুতেই বলেছে তাদের কোনো বকাঝকা করা যাবে না। স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে গাদা-গাদা ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে টিনভর্তি সরিষার তেল আসতো ঘুষের সামগ্রী হিসেবে। খাওয়া-দাওয়ার এমন অপচয় আমি এখনও দেখি নাই, কিন্তু আমাকে সকালে নাস্তা দিত না। দুইটা মেয়েকে পড়ানোর জন্য আমাকে নাস্তা দেওয়া নাকি তাদের পোশায় না। আমার কাছে এমন পয়সাকড়ি থাকতো না যে নাস্তা কিনে খাব। টিফিনের সময় সেখানে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতাম। এই ঘটনাটা আমার স্ত্রী যতবার শোনে ততবারই চোখের পানি ফেলে।

ভালো পোশাক নিজের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটা যে কোন বয়সের জন্যই প্রযোজ্য। এই একটা দিকে আমি এতটাই ভুগেছি যে এখন ও ভুলতে পারি না কতটা প্রতিকূলতা তৈরী করেছিল আমার পোশাক। হাইস্কুলে যাবার পর কখনও অন্যদের মত শার্ট পরি নাই। দর্জি দিয়ে শার্ট বানানোর জন্য আমার বাবা বিদেশ থেকে আসা মহিলাদের সাটিনের বড় গাউন কিনতেন। সেখানে রংটা কোন বিষয় নয়। সাইজে বড় বলে হয়তো পার্পল রং অথবা মেজেন্টা রঙের গাউন কিনে আনলেন। সেই কাপড়ের শার্ট পরে গ্রামের স্কুলে গিয়েছি। সহপাঠীরা ভয়ে লুকিয়ে হেসেছে, যা আমার চোখে পড়তো ঠিকই। ভয় পেতো এই কারণে যে আমি যদি স্কুলে না আসা আমার কোনো চাচাতো ভাইকে কারও নাম বলতাম তাহলে তারা নির্ঘাত স্কুল ছুটির পর তাকে পেটাতো। আমার এই ভাইয়েরা আমাকে নিয়ে গর্ব করতো। তাছাড়া আমার পোশাক নিয়ে তামাশা করার ব্যাপকতা অতটা ছিল না এই কারণে যে আমি ক্লাসের সেরা ছাত্র পড়াশুনার ফলাফলে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় একবার পায়ে হেঁটে গোপালগঞ্জ গেলাম বই কিনতে। রাতে বাড়িতে ফিরে ঘামে ভেজা সাটিনের শার্টটি বেড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখি শুকানোর জন্য। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘামে ভেজা শার্টটি ছাগলে খেয়ে ফেলেছে। এটা সেই হাসির গল্পের মত মনে হতে পারে যেখানে শিক্ষক ছাত্রের কাছে হোমওয়ার্কের খাতা চাইতে ছাত্র বললো, ‘স্যার ছাগলে আমার হোমওয়ার্কের খাতা খেয়ে ফেলেছে’। শার্ট না থাকায় সেদিন স্কুলে যেতে পারি নাই। সেসময় নিয়ম ছিল কেউ স্কুলে না আসলে তাকে ধরে নেওয়ার জন্য ৩/৪ জন ছাত্রকে পাঠানো হত। তারা এসে আমার অবস্থা দেখে ইউসুফ সিকদার নামের ধনী সহপাঠীর বাড়ি থেকে একটা শার্ট নিয়ে আসে। সেই শার্ট পরে আমি স্কুলে যাই।

 

এরকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অষ্টম শ্রেণী শেষ করে যখন আমি খুলনার সব থেকে সেরা স্কুল সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলে যাই তখন আমার গায়ে এক সেট সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। এই স্কুলে কোন ড্রেসকোড ছিল না। পায়ে ছিল স্পঞ্জের স্যান্ডেল। এই পোশাকে প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকতে সহপাঠীরা এমনভাবে হেসে উঠলো যেন আমি একটা হাসির বস্তু। ক্লাসে কোন শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড়ালেও একইভাবে আমার সহপাঠীরা হাসাহাসি করতো। জীবনে নিজেকে কখনো এতটা অসহায় ও ছোট মনে হয় নাই। মাঝে মাঝে মনে হত সব ছেড়ে আবার গ্রামের স্কুলে ফেরত যাই। পরোক্ষণে মনে হত তাহলে তো আমি আর ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব না। আমি প্রতিদিন সকালে সামান্য নাশতা করে ৪ মাইল পায়ে হেঁটে স্কুলে এসেছি, দুপুরে ৩টা বিস্কুটের টিফিন খেয়েছি, ছুটির পর আবার ৪ মাইল হেঁটে লজিংয়ে ফিরেছি। এটা ছিল আমার ক্ষুধার কষ্ট, শরীরের কষ্ট। এগুলোকে কখনোই গুরুত্ব দেই নাই। আমার সবথেকে কষ্টের অভিজ্ঞতা আমাকে দেখে সহপাঠীদের ঠাট্টা তামাশা। এসব টানাপোড়েনে প্রথম পরীক্ষায় তেমন ভালো ফলাফল হয় নাই। আমার সহপাঠীরা সবাই খুলনা শহরের স্থানীয় পরিবার থেকে এসেছে। আমার মত এমন বহিরাগত কাউকে দেখি নাই। একসময় মনে হতে শুরু করলো যে এখানে আমার আসা বোধহয় ঠিক হয়নি। এরকম মানসিক অবস্থায় একদিন একা স্কুল বারান্দার রেলিং ধরে উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর পিছন থেকে একজন আমার ঘাড়ের উপর হাত রেখে দাঁড়ালো। পিছন ফিরতেই সে নিজের পরিচয় দিলো, ‘আমি আব্দুল্লাহ ইসহাক’I তার মুখ দেখে এটা মনে হয়েছিল যে সে আমাকে অপমান করতে আসে নাই। সে শুধু বললো, ‘গত কয়েকমাস ধরে দেখছি ক্লাসের সবাই তোমাকে নিয়ে কী করছে। এটা ওদের নিষেধ করে বন্ধ করা যাবে না। এটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় ভালো রেজাল্ট করা। আমার কাছে সাইন্সের বিষয়গুলোর অনেক বই আছে। তোমাকে আমি সেগুলো ধার দেব। ওই বইগুলো ক্লাসের আর কারও নাই’I এর ক’দিন পর ফিজিক্সের শিক্ষক নিত্তনন্দ গোলদার চার্লস ল ও বয়েলস ল এর উপর একটা নোট তৈরী করতে বললেন। সাথে তিনি এটাও বললেন যার নোটটা সেরা বিবেচিত হবে সেটাই সাইক্লোস্টাইল করে সবাইকে পড়তে দেওয়া হবে। কয়েক বছরের প্রশ্নপত্র দেখে এই নোটকে আমাদের ব্যাচের মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কথা মত আমার সদ্য পরিচিত বন্ধু আব্দুল্লাহ কয়েকটা বই ধার দিলো। তার আগে সে নিজের নোট তৈরী করেছে। আমি দুই রাত জেগে আমারটা তৈরী করলাম। নির্দিষ্ট দিনে সবাই নোট জমা দিলো। সপ্তাহখানেক পর ফিজিক্সের শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে আমার ডাকলেন। আমি দাঁড়াতেই যথারীতি সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। এই ব্যাপারটা বোধহয় স্যার আগে থেকে লক্ষ্য করেছেন যে প্রায় সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এবার তিনি রেগে তাদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমরা হাসি বন্ধ কর। যাকে নিয়ে হাসছো তার নোটই সেরা বলে বিবেচিত হয়েছে যা আমি সাইক্লোষ্টাইল করে এনেছি। এটাই তোমাদের পড়তে হবে’I এই একটা ঘটনাই আমার এসএসসি পাশ করা পর্যন্ত সবার হাসি থামিয়ে দিল। আমি আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম।

আমার তৈরী ফিজিক্সের নোট সবার জন্য গৃহীত হওয়ার পর ক্লাসে আমাকে নিয়ে শুধু হাসি তামাশাই বন্ধ হয় নাই, আস্তে আস্তে আব্দুল্লাহ ইসহাক ছাড়া আরও বন্ধুরা এগিয়ে আসে। মোস্তাক আহমেদ নামে এক বন্ধু আমার সব কথা শুনে একদিন তাদের বাসায় নিয়ে যায়। তার বাবা একজন পূর্ব-পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। আমার বন্ধু তার বাবার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এমন রাশভারী লোক আমি কম দেখেছি। আমার পাশে বসে কিছু খোঁজ-খবর নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। আমি বন্ধুর দিকে তাকাতেই সে বললো, ‘আমি বাবাকে তোমার সব কথা বলেছি। আমার বাবা রংপুরের এক অজপাড়াগাঁ থেকে নিজ চেষ্টায় উঠে এসেছেন। তিনিও গ্রামে ৪ মাইলের বেশি পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে গিয়েছেন। এই কারণেই তিনি তোমার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে’।

 

নবম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার পর একটা আমূল পরিবর্তন আসে বন্ধুদের ভেতর। পরীক্ষার ফলাফলে আমাকে নিয়ে তামাশা করা সব বন্ধুদের টপকে প্রথম ৬জনের ভেতর চলে আসি। আমার জীবনের সেরা বন্ধু আব্দুল্লাহ আমাকে একটা কথা বলেছিলো যা আমার আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিয়েছিল, ‘তুমি মেধায় কারও থেকে পিছিয়ে নাই। তোমার সমস্যা আত্মবিশ্বাসে। তোমার বর্তমান প্রতিকূল অবস্থাটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যদি তুমি নিশ্চিতভাবে জান তোমার গন্তব্য কোথায়’। আমার বন্ধুর এই কথাটা এখনো আমি স্মরণ করি খারাপ সময়ে। আমি যদি ভালো লেখক হতাম তাহলে এই বন্ধুকে নিয়েই একটা বই লিখতাম। আমাদের দুজনের কথাবার্তা নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্রদের মত ছিল না। কখনো আমরা তুই তুকারি করে কথা বলতাম না। এক ধরণের পারস্পরিক সম্মানের জায়গা বজায় ছিল আমাদের মাঝে। আমার কোন পারিবারিক শিক্ষা ছিল না। জীবনে সাফল্যের জন্য পড়াশুনার বাইরের জগৎটাও যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা আব্দুল্লাহর কাছ থেকেই জেনেছি।

 

দশম শ্রেণীর প্রথমদিকে আবার আমার থাকার জায়গার সমস্যা হল। রূপসা নদীর উত্তর পাড়ে যে লজিংয়ে ছিলাম তারা অন্য জায়গায় বদলী হওয়াতে আবার আমি বস্তুহারা হই। তখন আমাকে খুলনার একটা মেসে উঠতে হয় যেখানকার বাসিন্দারা প্রায় সবাই ছিল বিভিন্ন কল-কারখানার শ্রমিক। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমি যে রুমে ছিলাম সেখানে আরও দুইজন ছিল যার একজন রাস্তায় ক্যানভাস করে ওষুধ বিক্রি করতো। এরা সাধারণত খুব চালাক চতুর বাকপটু লোক হয়। এই লোকটি আমার অন্য রুমমেট সাদেকের সাথে তার কঠিন প্রেমের গল্প করতো চুপি চুপি। তারা সচেতন ছিল আমার পড়াশুনার ব্যাপার নিয়ে। আমি কিন্তু তাদের সবকথাই শুনতাম এবং এই প্রেমিক লোকটিকে রীতিমত সিনেমার নায়ক হিসেবে দেখতে শুরু করি। এই মেসে পালা করে রান্না করার কথা থাকলেও সাদেক আমাকে কখনোই রান্না করতে দেয় নাই।

 

এই মেসে ওঠার সময় আমার বন্ধু আব্দুল্লাহকে নিয়ে থালাবাটি পানির গ্লাস, বদনা কিনতে এক দোকানে যাই। বদনাটা হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার বন্ধু বললো, ‘বদনা হাতে আমি রাস্তায় হাটছি তা আমার ভাই বোনেরা কল্পনা ও করতে পারবে না। কিন্তু আমার বন্ধুর জন্য তা আমি সানন্দে করছি’। জিনিসপত্রের ভেতর একটা দামী পানির গ্লাস ও কিনেছিলাম। মেসে গিয়ে দেখি ভুল করে একটার জায়গায় দুইটা একই রকমের দামী গ্লাস চলে এসেছে। আব্দুল্লাহ আমাকে নিয়ে তখনই রওনা দিলো বাড়তি গ্লাসটি ফেরত দিতে। পথে সে আমাকে প্রশ্ন করলো, ‘এই গ্লাসটি এতটা পথ দূরে গিয়ে কেউ হয়তো ফেরত দেবে না। তুমি ফেরত দিতে যাচ্ছ। তাতে কি নিজেকে তোমার স্পেশাল মনে হচ্ছে?’ আমি উত্তর দিতে দেরি করায় সে নিজেই বললো, ‘যা করা উচিত তাই তুমি করছো। অন্যদের সাথে তুলনা করে নিজেকে স্পেশাল ভাবার কোন কারণ নাই।’ এই হল আমার বন্ধু আব্দুল্লাহ যার প্রভাব এখন ও আমার ভেতর বিদ্যমান।

খুলনায় মিল শ্রমিকদের সাথে মেসে বসবাস এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এত কম বয়সে আমার কোনো সহপাঠীর এমন অভিজ্ঞতা আছে বলে জানা নাই। সাদেক নামের যে ছেলেটি অল্পবয়সে লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে মিল শ্রমিক হয়েছে তাকে আমি কখনো ভুলবো না। সে নিজে পড়াশুনা করতে পারে নাই বলে আমার দিকে খেয়াল রাখতো যাতে আমার পড়াশুনায় ব্যাঘাত না হয়। মাঝেমধ্যে আমার রান্না করার কথা থাকলেও সে কোনোদিন তা করতে দেয় নাই। কাজের থেকে ফেরার সময় আমার জন্য প্রায় প্রতিদিন ঝালমুড়ি থেকে শুরু করে কিছু না নিয়ে আসতো। মাস দুয়েক থাকার পর থেকেই চিন্তা করতে শুরু করলাম এখান থেকে বের হওয়া দরকার। গ্রাম থেকে উঠে এসে নতুন পরিবেশে সহপাঠীদের সাথে মানিয়ে চলা, পড়াশুনার ফলাফল ঠিক রাখা, তার উপর বাড়তি বোঝা মেসের পরিবেশে পড়াশুনা করা। বন্ধু আব্দুল্লাহর সাথে সব ব্যাপারেই আলাপ করতাম।

 

একদিন আব্দুল্লাহ নিজে থেকে বললো যে আমার জন্য কোন লজিং পাওয়া যায় কিনা তা খুঁজছে। এটা ১৯৬৮ সালে দশম শ্রেণীর মাঝামাঝি সময়ের কথা। আব্দুল্লাহ তার বাবার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু খুলনার বেশ নামকরা আইনজীবী আবুল কাশেম সাহেবের সাথে দেখা করে এবং আমাকে তাঁর বাড়িতে থাকার জায়গা দিতে অনুরোধ করে। আমার উপর দ্বায়িত্ব পড়লো দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা মেয়ে ও তৃতীয় শ্রেণীর একটা ছেলে পড়ানোর। মেস থেকে চলে আসার সময় সাদেকের সেই দুঃখভারাক্রান্ত করুন চেহারা আমি কোনো দিন ভুলব না। একদিকে সে আমাকে বলতো সেখান থেকে চলে আসা আমার লেখাপড়ার জন্য ভালো, অন্যদিকে চলে আসছি বলে ভীষণ মন খারাপ। বিভিন্ন রকম প্রতিকূলতার ভেতর পড়াশুনা চালানোর ফাঁকে আর কখনও সাদেকের সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই। সাদেক কোনোদিনই জানবে না যে ৪৯ বছর পর পরিণত বয়সে লেখা আমার আত্মজীবনীতে তাঁকে স্মরণ করছি।

 

জনাব আবুল কাশেমের মত ভদ্র, অমায়িক, বিনয়ী, সজ্জন লোক আমি জীবনে কমই দেখেছি। খুলনার আইনজীবী মহলে তিনি একটা বিশেষ ঘটনার জন্য পরিচিত ছিলেন। তা হল, তিনি এককভাবে আইনজীবী হিসেবে জীবনের প্রথম মামলা লড়েছিলেন তাঁরই সিনিয়র আইনজীবীর বিরুদ্ধে এবং জিতেছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক লোক ছিলেন এবং নিয়মিত তাবলিগ জামাতে যেতেন। আমাকে কখনও নামাজ রোজার কথা বলেন নাই। আমি অনেকটা তাঁকে খুশি করার জন্য নামাজ পড়া শুরু করি। এখানে থেকেই আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ৪০দিনের জন্য তাবলিগ জামাতে যাই। এই ৪০দিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে কাটাই। ভাবতে অবাক লাগে এই সময়ে মাঝে মাঝে আমাকে নামাজের পর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে মুসল্লীদের সামনে ওয়াজ করতে। এই তাবলিগ করার সময় আমার কথাবার্তায় এবং পোশাক-আশাকে এমন একটা পরিবর্তন আসে যে একদিন লঞ্চে করে খুলনা থেকে গ্রামের বাড়িতে যাবার পথে সবার অনুরোধে আমাকে নামাজের জামাতে ইমামতি করতে হয়। এই অবস্থাটা কলেজে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বহাল ছিল।

Fakir Rahaman
Author

Write A Comment

error: Content is protected !!