হুমায়ুন আজাদ স্যারকে নিয়ে একটা কথা প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে, ‘জীবিত হুমায়ুন আজাদের থেকে মৃত হুমায়ুন আজাদ আরো বেশি শক্তিশালী৷’

হুমায়ুন আজাদ না থাকলেও তাঁর খুরধার সৃষ্টি গুলো রয়ে গেছে এবং সেগুলো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ তাঁর লেখা পড়ে অনেক তরুণের বুদ্ধির মুক্তি ঘটেছে, তারা চিন্তা করতে শিখেছে নতুন করে, চেষ্টা করেছে প্রথা ভেঙে বেড়িয়ে আসতে৷ এটাই তাঁর বলিদানের সার্থকতা। যে গোষ্ঠীটি তাঁকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল, তারা আদতে ব্যর্থ হয়েছে, কেননা তিনি নিশ্চিহ্ন তো হন নি, বরং দিনকে দিন আরো তীব্র ভাবে বিরাজ করছেন আমাদের মধ্যে। যদিও এই পাঠকের সংখ্যাটি খুব একটা আশাপ্রদ নয়, তবুও সংখ্যাটি পূর্বের থেকে বেশি হবার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে হয়৷

অভিজিৎ রায়

অভিজিৎ রায়কে নিয়েও এরকমটা বলা যায়৷ আমরা যারা নিয়মিত বিভিন্ন ব্লগে ঢু মারতাম বা বিভিন্ন ফোরামে জড়িত ছিলাম অথবা যারা মধ্যবিত্তের চিরাচরিত সাহিত্য পাঠের যে ফর্ম, তার বাইরে এসে বিভিন্ন বিষয়ে বইপত্র পড়তো, তারা ব্যতিরেকে অভিজিৎ রায়ের বইয়ের কথা বা তাঁর লেখার কথা খুব বেশি মানুষ জানতো না। কিন্তু তাঁকে নৃশংস ভাবে হত্যা করার পর, যার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, অনেকের মধ্যে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি হল৷ সে সময় আজিজ মার্কেট বা পাঠক সমাবেশে অভিদার যত বই ছিল দ্রুত ফুরিয়ে যেতে লাগলো৷ কিন্তু এই চিত্র বদলে গেল তাঁর দুই প্রকাশকের উপরে হামলার পর৷ অভিদার বই গুলো নতুন করে ছাপানো হল না৷ কিন্তু তাঁকে জানার আগ্রহ কি এতে কমেছিল?

মুসলমান বাঙালি সমাজে নাস্তিকতাকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়৷ অন্য যেকোন অপরাধের হয়তো ক্ষমা আছে কিন্তু নাস্তিকতার কোন ক্ষমা নেই। কেউ যদি জানতে পারে এই ব্যক্তিটি নাস্তিক, তাহলে সে ধরেই নেয়, পৃথিবীর যাবতীয় অন্যায় কাজ এই লোকের দ্বারাই সংঘটিত হয়! তাই মুসলমান সমাজে নাস্তিকতা অতি ঘৃণ্য একটি ব্যাপার। হিন্দু পরিবার থেকে উঠে আসা কেউ যদি নিজেকে নাস্তিক বলে দাবী করে তাকে হয়তো তিরস্কারের শিকার হতে হবে, কিন্তু আপনি যদি মুসলিম পরিবার থেকে এসে নিজেকে নাস্তিক দাবী করেন তবে জীবন সংশয় হওয়াটা বিচিত্র নয়৷

যে সময়টাতে মুক্তমনা লেখক ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে সে সময়টাতে নতুন নতুন অনেককে লেখালেখি করতে দেখেছি৷ অনেকে নিজেকে নাস্তিক হিসেবে দাবী না করলেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টা হালকা করে দেখার মত নয়৷ কিন্তু সমস্যাটা হল এদের কতজন তারুণ্যের জোশে পড়ে এমন করেছে আর কতজন পড়াশুনার কাজটি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে পুরাতন প্রতিষ্ঠিত ভালো ব্লগাররা অধিকাংশ লেখা ছেড়ে দিয়েছেন৷ অনেকেই দেশ ছেড়েছেন৷ এসব কারণে ব্লগ গুলোতে সেই তথ্যবহুল, চিন্তার খোরাক যোগানো লেখা গুলোর স্থান দখল করে নিয়েছে নব্য ব্লগারদের অগভীর লেখা গুলো৷ একদিকে এটা যেমন স্বস্তির ব্যাপার যে নতুন নতুন অনেকেই চিন্তার কাজটি করছে, প্রথা ভাঙার চেষ্টা করছে, নিজেদের প্রথাবিরোধী চিন্তা গুলো নিয়ে লিখছে; অন্যদিকে আবার তাদের প্রস্তুতিটা ঠিক মত হচ্ছে কিনা, তাদের পড়ার বা জানার ইচ্ছা আছে কিনা সেই প্রশ্নটিও এক ধরণের অস্বস্তির জন্ম দেয়। এই অস্বস্তি পাকা হয় যখন দেখি বিবর্তন নিয়ে একটা তুলনামূলক লেখার থেকে ধর্মীয় ফিগারদের পারিবারিক জীবন কেমন ছিল এটা নিয়ে খিস্তি করতেই অনেকের আগ্রহ বেশি!

প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বা এই ধরণের অপবিজ্ঞানের কুৎসিত বই গুলোর বিশাল সংখ্যক পাঠকের তুলনায় বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী মুক্তমনের অধিকারী হতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা অবশ্যই খুব সামান্য, তবে সংখ্যাটি ক্রমবর্ধমান। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে পড়া কেউ যখন আরজ আলী মাতুব্বর পড়ে সেটা নিয়ে আলোচনা করে, হুমায়ুন আজাদ পড়ে ধাক্কা খায়, অবাক হয়ে পড়ে অভিজিৎ রায় তখন তীব্র আধারেও সেই চোখেমুখে কিছুটা আলো দেখতে পাই৷

অভিজিৎ রায় কিংবা হুমায়ুন আজাদ এবং আরো যারা প্রাণ দিয়েছেন মুক্তচিন্তার জন্য, তাদের এই ত্যাগকে সম্মান জানানোর সব থেকে শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে তাদের সৃষ্টি, তাদের কথা, তাদের চিন্তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া। মুক্তমান ব্লগে অভিজিৎ দা’র সব গুলো বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায় ফ্রিতে। হুমায়ুন আজাদের বই গুলো আগামী প্রকাশনিতে জ্বলজ্বল করে এখনো অন্ধকার মেলাপ্রাঙ্গনে আলো ছড়ায়। আমাদের সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যবই যেভাবে আমাদের অমানুষ বানায় এবং অসহনশীলতার শিক্ষা দেয় তার বিপরীতে লড়াই করাটা কোন সহজ কাজ নয়। এ এক অসম লড়াই৷ যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ বইয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ঘৃণা করার তীব্র অনৈতিকতা শেখানো হয় এবং শিশুদের অধিকাংশ শিক্ষক ও অভিভাবক এই চিন্তা গুলোকেই লালন করে, সেখানে এই শিশুদের কিভাবে শেখানো যাবে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই?’ কিন্তু তারপরও চেষ্টা করে যেতে হবে৷

রাফী শামস

সবাইকে নাস্তিক হতে হবে সেটা জরুরী না, সেটা সম্ভবও না কখনো৷ লালনের সুরে হাহাকার আমরাও করতে পারি-

এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে…

কিন্তু এমন মানব সমাজ হয়তো কল্পনাতেই সম্ভব, বাস্তবে নয়৷ কিন্তু যেটা হতে পারে, সেটা হচ্ছে একটি সহনশীল সমাজ। যেখানে কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে নাস্তিক এই প্রশ্ন কোন গুরুত্ব বহন করবে না৷ এমন মানব সমাজ এই পৃথিবীতে আছে, বর্তমানেই আছে৷ কিন্তু সেই সমাজ ব্যবস্থা আমাদের এখানে হবে, এমনটা আশা করতেও ভয় হয়৷ আমাদের ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা যেভাবে গোড়ামি আর অন্ধবিশ্বাসকে পাকাপোক্ত হতে সাহায্য করে তাতে মোটামুটি সহনশীলতা, যতটুকু সহনশীলতা থাকলে আমার লেখা বা আমার বলা কোন কথার জন্য আমাকে কেউ হত্যা করতে উদ্যত হবেনা, ততটুকু সহনশীলতাও যদি এই সমাজে সৃষ্টি হয়, সেটাই হবে বিশাল বিজয়৷

কাজেই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে আমাদের শ্রেষ্ঠ চিন্তকদের লেখা গুলো ছড়িয়ে দিতে হবে৷ আরজ আলী মাতুব্বর, শিখা গোষ্ঠী, হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় সহ অনেক লেখক যারা বিজ্ঞান নিয়ে লিখেছেন, মুক্তচিন্তা নিয়ে লিখেছেন তাদের লেখা ছড়িয়ে দিতে হবে, আলোচনা করতে হবে, চর্চা করতে হবে৷ আমাদের নিজেদেরকেও লিখতে হবে এবং অতি অবশ্যই তার আগে অনেক বেশি পড়তে হবে। আমাদেরকেও হতে হবে ‘মৌলবাদী’ অর্থাৎ ফিরে যেতে হবে মূলের কাছে৷ আমাদের মূল কী? আমাদের মূল হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের বাঙালিয়ানা৷

আমার এক প্রিয় বন্ধু আজ বলছিলো, ‘যতদিন আমাদের গান আছে ততদিন পর্যন্ত আমাদের আশা আছে।’ আমি এই কথাকে আরেকটু বিস্তৃত করে বলবো, যতদিন আমাদের সংস্কৃতি আছে, ততদিন কিছুটা হলেও আশা আছে৷ যতদিন আমরা গান করবো, যতদিন আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবো, যতদিন আমাদের থিয়েটার গুলোতে নাটক হবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে হবে পাঠচক্র, যতদিন আমরা হুমায়ুন আজাদ-অভিজিৎ- অনন্তদের স্মরণ করবো প্রদীপ হাতে, ততদিন পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকবো৷

তুলনা করলে সংখ্যাটা হয়তো হাস্যকর রকমের ছোট হবে, কিন্তু এক এক করে হলেও এই সংখ্যাটা যেন বাড়তেই থাকে- সেটাই হতে হবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

শোকস্তব্ধ হয়ে ব্যর্থতা আর পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে এসে যখন দেখি আমার ছোট ভাইবোন প্যারাডক্সিকাল সাজিদ না খুঁজে আহমদ শরীফ- হুমায়ুন আজাদের বই কিনছে, বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে বইপড়া কর্মসূচিতে যাচ্ছে, নানা রকম ‘উদ্ধত’ প্রশ্ন করছে তখন নুয়ে পড়া মাথাটা একটু হলেও উঁচু হয়ে ওঠে। হোক তারা সংখ্যায় কম৷ কিন্তু তারা আছে তো৷ তারা থাকবে৷ যেকোন সমাজেই অল্প সংখ্যক মানুষই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করে। অভিজিৎ রায়দের আত্মত্যাগ সেই অল্প সংখ্যকদের খুজে পেতে এবং তাদের পাশে থাকতে আমাদেরকে শিক্ষা দেয়৷

মুক্তচিন্তার ধারণা পাশে রেখেও আমরা যদি আমাদের দেশের জন্ম প্রক্রিয়ার দিকে তাকাই, দেখবো, সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতার ব্যাপারটি আমাদের একেবারে মূলভিত্তি। সকল নাগরিকের সমান অধিকার- স্বাধীনতার একেবারে মূল চেতনা৷ বাঙালি এবং অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজ নিজ সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সহবস্থান আমাদের শক্তি। এই মূল বিষয় গুলোকে অস্বীকার করে যে মৌলবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ, তাকে আমরা অস্বীকার করি৷

জাফর ইকবাল স্যারের ভাষায়, “ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়ে যে বাংলাদেশ তৈরি করেছিল; আমরা সেই বাংলাদেশকে ফিরে পেতে চাই। এই বাংলাদেশ আমাদের সেই ত্রিশ লক্ষ মানুষের, তাদের আপনজনের। এই দেশ অভিজিতের, এই দেশ অভিজিতের আপনজনের। এই দেশ জঙ্গিদের নয়; এই দেশ ধর্মান্ধ কাপুরুষের নয়।”

হ্যাঁ, আমরা সেই বাংলাদেশ ফিরে পেতে চাই। তবে আমরা যারা সেই বাংলাদেশ ফিরে পেতে চাই, তারা কি ঠিকঠাক মত প্রস্তুত?

Write A Comment

error: Content is protected !!