১৮ সেপ্টেম্বর, হবিগঞ্জের লাখাইয়ের কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস। ৪৭ বছর পূর্বে এই দিনটিতে পাকি বর্বর পশু শক্তির হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হন ১২৭ জন সাধারণ মানুষ।

হবিগঞ্জ জেলার শেষ প্রান্ত ও ব্রাক্ষনবাড়িয়া জেলার মধ্যবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাটি এলাকার কৃষ্ণপুর গ্রাম। যোগাযোগের তেমন ভাল মাধ্যম নেই। বর্ষায় নৌকার আর শীত কালে পায়ে হেটে চলাচল করতে হয়। সে সময় গ্রামটিতে, শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই শিক্ষিত ও হিন্দুধর্মাবলী লোকের বসবাস।

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্প থেকে ১টি স্পিডবোট ও ৮ থেকে ১০টি বাওয়ালী নৌকায় করে ১০ থেকে ১৫ জনের পাকিস্তানী জল্লাদরা ওই গ্রামে আসে।

তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, লাখাই উপজেলার মুড়াকরি গ্রামের লিয়াকত আলী, বাদশা মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউকের আহাদ মিয়া, বল্টু মিয়া, কিশোরগঞ্জের লাল খা, রজব আলী, সন্তোষপুরের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়ার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একদল রাজাকার-আলবদর। আর তাদের পরামর্শেই পাকি পশুরা এ গ্রামে তান্ডবলীলা চালায়।

এদের মাঝে লিয়াকত আলী ১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্র ছিল। যুদ্ধের সময় মুসলিমলীগের সদস্য হিসেবে ফান্দাউক ইউনিয়নে রাজাকারের দায়িত্বে ছিল। রজব আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় ভৈরব হাজী হাসমত আলী কলেজের ইসলামী ছাত্র সংঘের কলেজ শাখার সভাপতি ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভৈরবে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে রজব আলী এলাকায় আল বদর বাহিনী গঠন করেছিল।

এই গণহত্যায়, অন্তত ১৩১ জন পুরুষকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করা হয়। পরে আগুন দিয়ে গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটপাট করে। এ ছাড়া গ্রামের নিরীহ নারীদের নির্যাতন করে। এ হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন আনুমানিক বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

বর্বর’দের হাত থেকে বাঁচতে গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছের একটি মজা পুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে আশ্রয় নেন। পাকিস্তানী জল্লাদ’রা চলে গেলে তারা হত্যাযজ্ঞ স্থল থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গ্রাম ত্যাগ করেন।

ঐ দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রভাত রায় (৬৬) বলেন- “হত্যাযজ্ঞের দিন পাক-বাহিনীর চেয়ে রাজাকার-আল বদরের সংখ্যাই বেশি ছিল। তারা ফায়ার করবে কখনো ভাবিনি। প্রথমেই তারা রামাচরণ রায়কে গুলি করে হত্যা করে। এ দৃশ্য দেখে আমিসহ অন্যান্যরা মজাপুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে প্রাণে রক্ষা পাই।”

অপর প্রত্যক্ষদর্শী গোপালকৃষ্ণ রায় জানান- গ্রামটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে হিন্দু লোকজন এসে ওই সময় আশ্রয় নেন। এ খবরটি রাজাকারদের মাধ্যমে পাকি বাহিনী জেনে যাওয়ার পরই তারা হামলা চালায়।

তিনি আরও জানান- ওইদিন নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পাকি জল্লাদ’দের গুলিতে নিহতদের লাশের সৎকার না করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ফেলে দিয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান।

গণহত্যার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় বাদী হয়ে লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামী করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০১০ ইংরেজী সনে ১১ আগস্ট হবিগঞ্জে বিচারিক হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি ১২ আগস্ট ২০১০ সনে, সিলেট বিভাগে মানবতা বিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা হিসেবে ট্রাইবুন্যালে অন্তর্ভূক্ত হয়। ওই মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে লিয়াকত আলী এবং আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী আজ অবধি আত্মগোপনে আছে।

২০১৬ সালের ১ নভেম্বর লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিষয়ে অভিযোগ গঠন করা হয়। এ দুজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৮ মে এই দু’জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। সেই থেকে তারা পলাতক রয়েছে।

এ বছরের আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল, উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রেখে আদেশ দেয়। এটি হবে যুদ্ধাপরাধের মামলার বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের ৩৫ তম রায়।

প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ হাই স্কুলের পাশের স্মৃতিস্তম্ভে ফুলদিয়ে গনহত্যা দিবসটি স্মরণ করে থাকে। হত্যাকান্ডে শহীদ ১২৭ জনের মধ্যে পরিচয় পাওয়া ৪৫ জনের নাম সম্বলিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ, নিজেদের অর্থায়নে নির্মান করেন স্থানীয় মানুষ। হত্যাকাণ্ডের শিকার ৪৫ জনের নাম আজও ওঠেনি শহীদ তালিকায়।

শহীদ’দের স্মরণে ঘটনাস্থলের পাশে সরকারের পক্ষ থেকে গত ২০১৫ সালে একটি বধ্যভূমি নির্মাণের কাজ শুরু করা হলেও, আজ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়নি।

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ এ.কে. কাওসার ও মোহাম্মদ নুর উদ্দিন।

ছবিঃ ১৯৭১ সালে মানিকগঞ্জ সাটুরিয়ায় গণহত্যার শিকার একটি পরিবার। ছবিটি হবিগঞ্জ জেলার লাখাইয়ের কৃষ্ণনগর গ্রামের নয়।

কৃতজ্ঞতা : গেরিলা ৭১

Write A Comment

error: Content is protected !!