এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে

যে কথাটা আমি ছোটবেলায় পড়েছি ও অদ্যাবধি ধারণ করে আছি তার রচয়িতা মোতাহার হোসেন চৌধুরী, “ সংস্কৃতি কথা” বই-খ্যাত মোতাহার হোসেন চৌধুরী। ইস্কুলের লাইব্রেরি থেকে ভাগ্যিস এক শিক্ষক জোর করেই দিয়েছিলেন বইটা। সেই থেকে অদ্যাবধি অসংখ্য বই পড়েছি, ভালোও লেগেছে অনেক বই। কিন্তু যে বইটা আমাকে বদলে দিতে সাহায্য করেছে সেটা “সংস্কৃতি কথা”।

“সংস্কৃতি কথা” গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের নামই “ সংস্কৃতি কথা”; ১৬ পৃষ্ঠার এ প্রবন্ধটা সকলের অবশ্য-পাঠ্য। ধর্ম, কালচার, জীবনের নীতি আদর্শ নিয়ে মূল্যবান কথা আছে এ প্রবন্ধে; যা বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব ছিল না মোতাহার হোসেন চৌধুরীর পক্ষে লেখা; ধর্মীয় মৌলবাদের “আনকালচারড” মানুষের হাতে বেঘরে নির্যাতিত এমনকি প্রাণ নাশের হুমকির মধ্যেও পড়তেন হয়ত।

যাক, সে অন্যকথা। ওই প্রবন্ধেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা আছে,যা তাঁকে বলেছিলেন এক পাদ্রী ভদ্রলোক, নাম ওয়াটসন। মোতাহার হোসেন চৌধুরী একবার মিলিটারি কন্ট্রাকটারের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। সে কথা জেনে পাদ্রী ওয়াটসন সাহেব তাঁকে বলেছিলেন,

“কবিত্বের প্রতিভাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে কন্ট্রাক্টার, বিশেষ করে মিলিটারি কন্ট্রাকটার হওয়া অপরাধ , মহাঅপরাধ। নিজের প্রতিভাকে মরতে দেওয়া আর নিজের আত্মাকে মরতে দেওয়া এক কথা”।

মোতাহার হোসেন চৌধুরী কিছু বলতে চেয়েছিলেন, সেটা বুঝে তিনি আরও বলেছিলেন,

তুমি বলবে তোমার সামান্য প্রতিভা আর little genius is a great bondage-সামান্য প্রতিভা কঠিন বন্ধন। কিন্তু সামান্য হলেও তা মূল্যবান। আর যা মূল্যবান তার যত্ন না নেওয়া মহাপাপ”।

মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে পাদ্রী ওয়াটসন সাহেব যা বলেছিলেন, আমি নিজে অসংখ্যবার তা থেকে বিচ্যূত হয়েছি। কিন্তু এ কথাটা আমি ধারণ করার ও প্রমোট করার চেষ্টা করি; বিশেষত যাঁরা সংগীত ও শিল্প-সাহিত্যচর্চা করেন তাঁদের উদ্দেশ্যে।

লেখালেখি বা কবিত্ব যতটুকু সামান্য প্রতিভা, সংগীত শেখা ও সংগীতকে কন্ঠে ধারণ করে তার চর্চা করা তা থেকে আরও অনেক বড় প্রতিভার কাজ। এ প্রতিভাকে মূল্য না দেয়া তাই মহাপাপ।

পাপ- পুণ্য ব্যাপারটা আপেক্ষিক এবং আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলো ও ধার্মিকেরা এ বিষয়টিকে পারলৌকিকতার মতো অজানা সংশয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাপ ও পুণ্য এ ব্যাপার দু্টো ইহলৌকিক ন্যায়-নীতি এবং অপচয় –অবক্ষয়ের সাথে জড়িত বলেই মনে হয়।

আর যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই, পরম শক্তিধর কেউ মানুষের ভিতরের প্রতিভা বা সৃজনশীলতার মতো ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন, তবে এ পরম শক্তিধরের দেয়া এ প্রতিভাকে চর্চা না করা কিন্তু ওই পরম শক্তিধরেরই অবমাননা- যা ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকেও কিন্তু মহাপাপ।

প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই ভিন্ন বা স্বতন্ত্র মাপে ও মাত্রায় নানান রকমের গুনাবলী প্রচ্ছন্ন আছে, তার বিকাশে যত্নবান না হওয়া তো অন্যায় এবং অপচয়ই।

রবীন্দ্রনাথের গানের কথায়

অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে,
তুমি আছ মোরে চাহি– আমি চাহি তোমা-পানে।
স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে ॥”

নির্ভয়ে নিজের সামান্য প্রতিভার সযত্ন অধ্যায়নের নামই পূজা বা উপাসনা।

ভজন সরকার
লেখক

Write A Comment

error: Content is protected !!