ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বড়ো ছেলে মইনুল হোসেন একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে যাননি। তিনি ঢাকায় থেকে পাকিস্তানী দালালদের সহযোগিতা করেন। এই দালালের নাম খোন্দকার আব্দুল হামিদ। এই খোন্দকার আব্দুল হামিদের ইঙ্গিতে কাদের মোল্লার সহযোগিতায় পাকবাহিনী ইত্তেফাক অফিস থেকে সাংবাদিক খোন্দকার আবু তালিবকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। মেরে ফেলে সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনকে।

১৯৬৯ সালে মানিক মিয়ার মৃত্যুর পরে সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন ‘মঞ্চে নেপথ্যে’ নামে কলাম লিখতে শুরু করেন। এই কলামে পাকিস্তানী দুঃশাসনকে তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করতে থাকেন। কলামটি সে সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন

এই সময়কালে সিরাজুদ্দিন হোসেন দুসপ্তাহের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি মাগুরা যান। সে সময়ে ইত্তেফাকে চাকরি করতেন জামায়াতে ইসলামী খোন্দকার আব্দুল হামিদ। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী। সম্পর্কে মইনুল হোসেনের আত্মীয়। সিরাজুদ্দিন হোসেনের অনুপস্থিতিতে মঞ্চে নেপথ্যে কলামটি মইনুল হোসেনের মারফতে খোন্দকার আব্দুর হামিদ ছিনতাই করে নেন। তিনি সেই থেকে সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে লিখতে থাকেন। এই লেখার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতাকামী মানুষদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে থাকেন।

সিরাজুদ্দিন হোসেন মাগুরা থেকে ফিরে এই অবস্থা দেখে রাগ করে ইত্তেফাক অফিসে যাওয়া ছেড়ে দেন। তখন মানিক মিয়ার স্ত্রী তাকে অনুরোধ করে আবার অফিসে নিয়ে আসেন। মইনুল হোসেন তাকে মঞ্চে নেপথ্যে কলামটি আর ফেরত দেননি। পাকিস্তানের দালাল খোন্দকার আব্দুল হামিদকেই দিয়ে রাখেন। হামিদ সেখানে পাকিস্তানী মতাদর্শই প্রকাশ অব্যাহত রাখেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেয় পাক বাহিনী। খোন্দকার আব্দুল হামিদের মাধ্যমে মইনুল হোসেন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপুরণ আদায় করে নেন। হামিদ তখন কুখ্যাত রাও ফরমান আলীর খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন। বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নে তাকে সহযোগিতা করেন। দেশে তখন পাকবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। লুটপাট করছে। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করেছে।

এর মধ্যে মইনুল হোসেনের ভাই আনোয়ার হোসেনকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। দুদিন পরে খোন্দকার আব্দুল হামিদের তৎপরতায় মঞ্জু ছাড়া পান।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও সিরাজুদ্দিন হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিখতে থাকেন। পাক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের খবর লেখেন। তখন জামায়াতে ইসলামীর পত্রিকা দৈনিক সংগ্রাম সিরাজুদ্দিন হোসেনকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

তারই সূত্র ধরে ডিসেম্বর মাসে চামেলী বাগের বাসা থেকে সিরাজুদ্দিন হোসেনকে ধরে নিয়ে যায় পাকবাহিনীর দোসররা। তাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলে।

দেশ স্বাধীনের পরে চারজনের বিরুদ্ধে সিরাজুদ্দিন হোসেন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে এক নম্বর অভিযুক্ত আসামী হলেন খোন্দকার আব্দুল হামিদ। ধরা পড়ে অন্যতম অপহরণকারী ইসরাইল। পেশায় কসাই ইসরাইল জামাতের কর্মী ছিল। পুলিশ খোন্দকার আব্দুল হামিদকে জিজ্ঞাসাবাদও করে। কিন্তু মইনুল হোসেন শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেনের স্ত্রীকে বলেন যে, তিনি যদি খোন্দকার আব্দুল হামিদের নাম অভিযুক্তের তালিকা থেকে তুলে না নেন, তাহলে ইত্তেফাক তাকে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধাদি দেবে না। আটটি সন্তান নিয়ে কপর্দকশূন্য শহীদ জায়া নূরুন্নেছা বেগম মইনুল হোসেনের কথা মেনে নেন। এই ভাবে একাত্তরের দালাল খুনী খোন্দকার আব্দুল হামিদ বিচার থেকে রেহাই পেয়ে যান। আর জামাতের ঘাতক ইসরাইলের সাত বৎসর কারাদণ্ড হয়। জিয়াউর রহমান তাকে মুক্তি দেন।

১৯৭৪ সালে বাসন্তি নামে একজন পাগল মহিলাকে জাল পরিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এই ছবির মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। এবং পচাত্তরের ঘাতকদের প্রোপাগাণ্ডা হিসেবে এই ছবিটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই বাসন্তিকে জাল পরানোর পরিকল্পনাটি ছিল মইনুল হোসেনের বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে পাকিপন্থারাই ক্ষমতায় আসে। মইনুল হোসেন তখন এই ঘাতকদের সহযোগিতা করেন। খুনি খোন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করেন।

জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা নিলে খোন্দকার আব্দুল হামিদ তাকে পাকিস্তানী ভাবাদর্শে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ তত্ত্বটি সরবরাহ করেন। এই তত্ত্বের মধ্যে দিয়েই জিয়া পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিবিদদের নিয়ে বিএনপি গঠন করেন। মন্ত্রী হন খোন্দকার আব্দুল হামিদ।

নিজের পিতা তোফাজ্জল হোসেনের মতাদর্শ নয়, জামায়াতপন্থী খোন্দকার আব্দুল হামিদের মতাদর্শই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সারাজীবন ধরেই বহন করে চলেছেন। ক বছর আগে জামায়াতে ইসলামী সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে স্বীকার করেন, তার সঙ্গে এই পাকিস্তানী ঘাতক সংগঠনের সম্পর্ক বহুদিনের।

তথ্য ঋণ : শহীদ সিরাজুদ্দিন স্মারকগ্রন্থ।

কুলদা রায়
লেখকi

 

Write A Comment

error: Content is protected !!