ফটোগ্রাফার শহিদুল আলম কুখ্যাত রাজাকার সবুর খানের ভাগ্নে কিনা জানি না। রাজাকার হিসেবে ধরা পড়ার পর জেলখানা থেকে সবুর খান বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লিখেন, ‘স্নেহের মুজিব! তুমি আমি অনেক আগে দীর্ঘ সময়ে এক সাথে রাজনীতি করেছি। কত সুখ ও দুঃখের স্মৃতি! আজকে তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আমি জেলে আছি। এটা তোমার কাছে কেমন লাগে?’

এই চিঠির সত্যতা সম্বন্ধে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে কিছু প্রমাণ মেলে। সবুর খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিলো সেটা জানা যায় ওখানে। যাই হোক, এই চিঠি পড়ে বঙ্গবন্ধু কুখ্যাত রাজাকার সবুর খানকে জেল থেকে মুক্ত করে আনেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনায় হিন্দুদের জন্য ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন এই সবুর খান। গণিমতের মাল দুহাতে লুট করেছেন। কিন্তু ভুললে চলবে না তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নায়কদের একজন! নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, মাওলানা আকরম খাঁ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খাজা নাজিমুদ্দীন, খান-এ-সবুর প্রমুখ ইনারা সবাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একেকজন লড়াকু সৈনিক। এই সবুর খান সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমান অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ভুয়শী প্রশংসা করেছেন। কিভাবে খুলনায় সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধন জানিয়েছিলো সবুর খান, কিভাবে মুসলিম লীগের মিটিং সফল করেছিলো ইত্যাদি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে পারেন এখান থেকে- http://www.amarboi.com/2012/09/ausamapta-atmajiboni-sheikh-mujibur-rahman.html

মনে রাখতে হবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মহান নায়করাই রাজাকার শান্তি কমিটি করেছিলো। ভারতের দালাল ও হিন্দুদের শায়েস্তা করে পাকিস্তানকে অখন্ড রাখাই তাদের পবিত্র কর্তব্য ছিলো। সেটি করতে তারা কোন ত্রুটি করেনি। আওয়ামী লীগের ইতিহাস পাঠ করে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের আগের কোন ইতিহাস নেই। আকাশ থেকে যেন ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ আর ‘বিপক্ষ শক্তি’ পয়দা হয়ে ফাইট করেছে। দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক সবুর খানকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগর বলেছে একবার! কারণ হিসেবে বলেছে পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না। তা না হলে নাকি মুসলমানদের হিন্দুদের অধিনে থাকতে হতো। হে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সৈনিক, আপনি কি এই কথাকে মানেন? যদি না মানেন তাহলে পাকিস্তান সৃষ্টির অপরাধ আগে কবুল করে নেন। দুই, যদি মানেন তো পাকিস্তানকে ঘেণ্না করার আগে পাকিস্তান সৃষ্টির লোকজনদের ভূমিকা কার কতটুকু তার হিসাব করতে বসেন। কেউ সবুর খানের ভাগ্নে তাই তাকে গ্রেফতার করলে চুপ করে থাকতে হবে? কেউ বিএনপি জামাত করলেই তার প্রতি অন্যায় চাপিয়ে দিতে হবে? যদি সেটাই নিয়ম হয় তাহলে ইতিহাসের এই পাঠগুলো একবার মিলিয়ে নিয়ে ফের আপনি ভাবতে বসুন দ্বিতীয়বার-

আগেই বলেছি, কুখ্যাত রাজাকার শান্তি কমিটির মেম্বারদের বেশির ভাগই সাবেক পাকিস্তান আন্দোলনের মহা তারকারা ছিলো। এসব কারণেই কি এদের প্রতি বঙ্গবন্ধু কখনই কঠরতা দেখাতে পারেননি? তাজউদ্দীন আহমদ এদের বিচার করতে গেলে ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে ৩৬৪০০ দালালকে ছেড়ে দেয়া হয়। এদের মধ্যে সবুর খান, শাহ আজিজ অন্যতম। শাহ আজিজকে মুক্ত করতে তার স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। বঙ্গবন্ধু যতদিন শাহ আজিজ মুক্ত না হবে ততদিন তার পরিবার মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন। মুক্ত হবার পর বাইশ হাজার টাকার গাড়ি উপহার দেয়ার কথা জানা যায়। শান্তি কমিটির প্রধান খাজা খয়েরউদ্দিনকে মুক্ত করে নিজ হাতে পাকিস্তান যাবার টিকিট ধরিয়ে দেন। পড়ুন ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস, লেখক অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। অনলাইন থেকে বইটি পড়তে পারেন- https://www.liberationwarbangladesh.org/2014/08/blog-post.html

এদেশের ইতিহাসটা এইবার একবার বোঝার চেষ্টা করুন। লজ্জ্বা ছাড়া এ থেকে কিছু পাবেন বলে মনে হয় না।। আগেই বলেছি খান-এ সবুররা ছিলেন পাকিস্তানের মহানায়ক। খুলনা যে পাকিস্তানের ভাগে পড়েছে কথিত আছে এতে সবুর খানের ব্যাপক ভূমিকা ছিলো। তরুণ শেখ মুজিব এইসব নেতাদের কাধে কাধ দিয়ে পাকিস্তানের জন্য লড়েছেন। পাকিস্তান আন্দোলন ছিলো চরম সাম্প্রদায়িক একটি আন্দোলন। এদেশ থেকে হিন্দুদের মেরুদন্ড চিরদিনের মত ভেঙ্গে দেয়াই ছিলো পাকিস্তান আন্দোলনের মূল লক্ষ। হয়েছিলো সেটাই। সাম্প্রদায়িক নেতারা পাকিস্তান কায়েম করেছে রক্তক্ষয়ী এক দাঙ্গার মাধ্যমে। সেই পাকিস্তানই যখন ২৩ বছর পর ভাঙ্গনের মুখে পড়ে তখন সবুর খানরা সেটাকে রুখে দিতে ফের ঘুরে দাঁড়ায়। এখানেই সবুর খানদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের বিরোধ। সেই ‘বিরোধ’ কেমন ছিলো তা তো আজিজ সবুর খয়েরউদ্দীনদের প্রতি সদয় আর ভালোবাসা থেকেই বুঝা যায়। এখন কেউ যদি রাজাকারের ভাগ্নে হয়েও থাকে, বিএনপি জামাতের সমর্থক হয়েও থাকে- সেই অপরাধ মাপতে বসে আশা করি আপনি ওজনে কম দিবেন না!

সুষুপ্ত পাঠক

Write A Comment

error: Content is protected !!