একাত্তরের জল্লাদ মেজর রাজা নাদের পারভেজ খান

0

১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান ‘সিতারা ই জুররাত’ উপাধি দিয়েছিল তার সেনাবাহিনীর অন্যতম অমানুষ রাজা নাদের পারভেজ খানকে। অমানুষটি একাত্তরে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ডে মানবতার অবমাননাকর সবগুলো অপরাধ করেছিল।

একাত্তরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পটুয়াখালী, পিরোজপুর এবং বরগুনা এ তিনটি জেলায় পরিচালিত হয়েছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা, লুঠ, অগ্নিসংযোগ এবং নারী নির্যাতন। এই তিন জেলায় সাক্ষাৎ জল্লাদের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছিল তৎকালীন মেজর রাজা নাদের পারভেজ খান।

৮৫ সালে এরশাদ সরকার এর আমলে বাংলাদেশে এসে ঘুরে গিয়েছিল এই জল্লাদ যুদ্ধাপরাধী

পিরোজপুরে এপ্রিলের দিকে অবস্থানকালীন সময়ে,মেজর নাদের পারভেজ খান সতীর্থ জল্লাদ কর্নেল আতিক, ক্যাপ্টেন এজাজ, ক্যাপ্টেন কাদরি, ক্যাপ্টেন এরশাদ (জানজুয়ার আত্মীয়) ও অন্যান্য হাবিলদার সুবেদারদের সাথে হত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের নির্দেশসহ ভয়াবহ সব অপরাধ সংঘটন করে।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানী এই জল্লাদকে দেখা যায় পটুয়াখালী জেলায়, এখানে সে সাক্ষাৎ নরকের দূত হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। পটুয়াখালীর তৎকালীন ট্রেজারি কর্মকর্তার (নাম উল্লেখ করছিনা সঙ্গত কারণেই) স্ত্রী ও শ্যালিকাকে জোরপূর্বক রক্ষিতা হিসেবে ব্যবহার করেছে। পটুয়াখালীতে নাদেরের জন্য প্রতিদিন একাধিক নারীকে জোরপূর্বক ধরে আনা হতো।

নাদেরের এসব ঘৃণ্যকাজের অনেক প্রত্যক্ষদর্শী আজও বর্তমান। তাঁদেরই একজন আমাদের প্রিয় শ্রদ্ধেয় সুহৃদ শ্রাবণী এন্দ চৌধুরী, তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে নাদেরের ভূমিকার ক্ষুদ্র অংশ ( লিঙ্কঃ https://bit.ly/2THFrK2 )।

শ্রাবণী’দি জানিয়েছেন, ‘অসম্ভব অত্যাচারী ছিলো এই মেজর। আটঘর কুড়িয়ানা জ্বলিয়েছে এই মেজর। প্রতিদিন বিকেল হলেই গুলির আওয়াজ শুনতে পেতাম। নিরীহ মানুষদের লাইন করে গুলি করতো। প্রায় সময় জেলে গিয়ে কয়েদীদের গুলি করতো। মৃতদেহগুলো নিয়ে নদীতে ফেলে দিতো। স্বাধীনতার পর সার্কিট হাউস থেকে একশ র উপর মেয়েকে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো। গায়ে একটা সুতোও নেই। কেউ প্রগনেন্ট, কেউ তখন বদ্ধ পাগল। ওরা বুঝতেই পারেনি ওরা মুক্ত। সামনের দরজা দিয়ে না গিয়ে এরা দেয়াল টপকে পালাতে চেষ্টা করছিলো। আমি দেখেছি কতো মেয়ে সোজা দৌড়ে গিয়ে নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে। অনেককে তাদের পরিবার গ্রহন করে নি। ওরা পরে ভিক্ষা করতো।”

পটুয়াখালী জেলখানায় নারীদের আলাদাভাবে রাখা হতো, নাদেরের সাথে ক্যাপ্টেন মুনির ও হাবিলদার শাহাদাৎ হোসেনের নামও জানা যায়। একাত্তরের নির্যাতনের শিকার সুভাষ চন্দ্র রায় জেলখানায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, মেজর নাদেরের বরগুনায় চলে যাবার পর তার স্থলাভিষিক্ত মেজর ইয়ামিনের সময় সুভাষ চন্দ্র ছাড়া পান। উল্লেখ্য, পটুয়াখালী জেলখানায় একটি বধ্যভূমি আছে যেখানে অন্তত পাঁচশত শহীদের দেহ রয়েছে। মাতবর বাড়ির কাছে আছে ১৭ জন শহীদের বধ্যভূমি, নতুন জেলখানার পাশে আছে বধ্যভূমি।

২৮ মে ১৯৭১ সেদিন শুক্রবার, জেলা সামরিক আইন প্রশাসক (ডিএমএলএ) হিসেবে এদিন মেজর নাদের পারভেজ খান বরগুনায় আসে। এরপর ২৯ ও ৩০ মে ১৯৭১, পরপর দু’দিন জেলখানায় গণহত্যা চালানো হয়। ২৯ মে শনিবার, বরগুনা জেলা স্কুলে প্রথম ক্লাসের ঘণ্টা বাজবার সাথে সাথে জেলখানায় শুরু হয়েছিল গুলিবর্ষণ, ছোট্ট জেলা শহর বরগুনা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সে মুহূর্তে। কথিত আছে, সবাই যে যার স্থানে অনড় হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ফারুকুল ইসলাম ব্যান্ডার (তিনি পাঁচবার গুলির মুখে প্রাণ পেয়েছেন এবং তাঁর দুই সহোদর একাত্তরে শহীদ) জানিয়েছেন, মেজর নাদের পারভেজের হুকুমে এক পাকিস্তানী সেনা নারী সেলের তালা খুলে চারজন নারীকে বের করে নিয়ে যায় সিঅ্যান্ডবি’র ডাকবাংলোয়। সেখানে মেজর নাদের সহ অন্যান্য পাকিস্তানী অমানুষরা পাশবিক নির্যাতন করে পরদিন জেলে ফেরত পাঠাত। এসময় তাঁদের রক্তে হেঁটে যাবার রাস্তা লাল বর্ণ ধারণ করতো।

একাত্তরের ডিসেম্বরে ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদের আত্মত্যাগে এবং অগণিত পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবার মূল্যের বিনিময়ে যেদিন বাংলার মাটিতে পাকিস্তানী হায়েনার পাল আত্মসমর্পণ করে সেদিন এই পাকিস্তানী জল্লাদ কোন স্থানে ছিল আমাদের জানা নেই। তবে, আত্মসমর্পণের পর ৬২৮ নম্বর যুদ্ধবন্দী হিসেবে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানে ফিরে যায়।

এরপর আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতির এক সাযুজ্যপূর্ণ অবস্থান। আমাদের দেশে যেভাবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধী জল্লাদদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো কাজে যুক্ত করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে একাত্তরের জল্লাদ, রাজা নাদের পারভেজ খানকে পাকিস্তানে বরণ করা হয়েছে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে, এবং বাংলাদেশের মতোই তাকে দেয়া হয়েছে মন্ত্রিত্ব। এই পাকিস্তানী জল্লাদ পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে ৩ দফায় দায়িত্ব পালন করে।

১৯৮৭ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২৯ মে ১৯৮৮ পর্যন্ত এই জল্লাদ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। এরপর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ‘পানি ও বিদ্যুৎ’ মন্ত্রী এবং সর্বশেষ ৬ আগস্ট ১৯৯৮ থেকে ১২ অক্টোবর ১৯৯৯ পর্যন্ত যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিল।

নৃশংস যুদ্ধাপরাধ করবার পর যুদ্ধবন্দী হিসেবে ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের পর সে যথাক্রমে, ইসলামি জামহুরি ইত্তেহাদ, মুসলিম লীগ হয়ে ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি ইমরান খানের ‘তেহরিক-ই-ইনসাফের’ ছাতার নীচে আশ্রিত।

১৯৪২ সালের ১১ নভেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে জন্মেছিল বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী এই জল্লাদ ও নারী নির্যাতক। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৭৪ সালে যুদ্ধবন্দী ফেরত পর্যায় পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল সে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদচ্যুত হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে। একাত্তরে বাংলাদেশের অগণিত নিরীহ মুক্তিকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত তার অস্তিত্ব।

আমরা কি জানি, নাদের পারভেজের মতো আরও কত জল্লাদ বিনা বিচারে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদের সাথে আমরা কি বেইমানি করিনি ? আমরা কি এসব জল্লাদের বিচারের দাবীতে বিশ্বমঞ্চে উচ্চকিত হয়েছি ?

বিচার করবে সিমলা চুক্তি !!! (বানোয়াট হাস্যকর মূর্খের যুক্তি)
****************************************************************

আরও একটি মারাত্মক ভুল আমরা করে চলেছি অজ্ঞানতবশত। সিমলা চুক্তি অনুসারে এসব পাকিস্তানী জল্লাদদের বিচার হবার কথা নয়, কোনদিন ছিলোনা। ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি স্রেফ ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক একটি চুক্তি বৈ কিছু নয়। জাতিসংঘের সাইটে প্রাপ্ত সিমলা চুক্তির দলিল দেখুন https://bit.ly/2ZgJYEM , এই চুক্তির কোথাও পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে একটি শব্দ লেখা নেই।

বরং, ১৯৭৩ সালের ২৮ শে আগস্ট দিল্লিতে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে, ‘Agreement on Repatriation of Persons’ শিরোনামে ভারতের প্রতিনিধি পি এন হাসকার এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজে আহমেদের স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়ে ধোঁয়াশাপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ আছে। (সূত্র ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় https://bit.ly/2Mql3wm )

এরপর, ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল, সেই দিল্লীতেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মাঝে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাঝে আবারও ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিষয়ে কিছু ধোঁয়াশাপূর্ণ কথা লিপিবদ্ধ হয়। সেবার এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের কামাল হোসেন, ভারতের শরণ সিং এবং পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ। (চুক্তির ধারাসমূহ দেখুনঃ https://bit.ly/2Z83O93 )

রাষ্ট্র কি করবে সেটা নির্ভর করে তার দর কষাকষির শক্তির ওপর, কূটনৈতিক শক্তির ওপর, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। আপামর মানুষের পক্ষে, ১৯৫ পাকিস্তানী জল্লাদের ভেতর বেঁচে থাকা একটি জল্লাদের বর্তমান ও সাম্প্রতিক অতীত আমরা জানিয়ে যাচ্ছি বাংলাদেশের মানুষের কাছে।

এই জল্লাদের প্রতীকী বিচার হলেও যেন বাংলার মাটিতে হয় সেই দাবী সশব্ধে ঘোষণা করার ঔদ্ধত্য দেখাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা রাখিনা আমরা। আজ আপনাদের রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির বিষয় আশয় থাকতে পারে, আপামর মানুষের সেসব নেই।

ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদের আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করি, দাবী করি একাত্তরের সকল জল্লাদের শাস্তি।

(বিনীত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি শ্রদ্ধেয়, শ্রাবণী এন্দ চৌধুরী’র কাছে। তাঁর থেকে এই জল্লাদের বিস্তারিত খোঁজার তাড়না লাভ করি।)

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ১৯১ জন – ডাঃ এম,এ,হাসান এবং War Crime Fact Findings Committee’র সকল সদস্যদের। যাঁদের অসামান্য কাজের ফলে বহু তথ্য উঠে এসেছে পুরো বাংলার বধ্যভূমি থেকে।

কৃতজ্ঞতা : গেরিলা ৭১

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!