মাশারফি বিন মরতুজা পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ বছর বয়সী ছয় ফুটের চেয়ে সামান্য বেশী উচ্চতার এদেশের একজন বিবাহিত পুরুষ নাগরিক। মিরপুরের দিকে কোথাও থাকে, ওর বাচ্চারা স্কুলে যায়।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ওর পিতা এখনো জীবিত আছেন, পিতাপুত্রের সম্পর্কও ভালো। মাশরাফি সম্পর্কে শুনেছি, ওর এলাকায় লোকজন ওকে বেশ পছন্দ করে। সহজ জীবনযাপন, লোকজনের সাথে অনায়াস অনাড়ম্বর মেলামেশা, এলাকার মুরুব্বীদের সাথে বিনীত আচরণ করা, বন্ধুদের সাথে আন্তরিক, ছোটদের সাথেও অনায়াস স্নেহপ্রবন বড়ভাইয়ের মতো আচরণ- এইসব মিলে মাশরাফিকে সকলে বেশ আপন আপন মনে করে।

আর সারা দেশের মানুষের কাছে মাশরাফি যে কি জিনিস সে তো আর বলে বুঝানোর কিছু নাই। আমরা সকলেই আমাদের এই ছেলেটিকে ভালোবাসি। আজ থেকে বহু বছর পরেও, যখন আমি থাকবো না, আপনি থাকবেন না, মাশরাফি বা ওর ছেলেমেয়েরাও থাকবে না, তখনো সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেটের কথা উঠলেই সারা দুনিয়ের মানুষ মাশরাফিকে উল্লেখ করবে।

এইসব কিছুর কারণে কি মাশরাফি তাঁর নিজের জীবনটা নিজের মতো করে যাপন করতে পারবে না? সে যখন বিবাহ করেছে তখন কি সে দেশের সকলের অনুমতি নিয়ে করেছে? নাকি ফেসবুকে পাত্রীর ফটো দিয়ে আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছে পাত্রী পছন্দ কিনা। সে ধর্ম পালন করে, ঘটা করে পুত্রকে সাথে নিয়ে ঈদের জামাতে যায়, আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যায়? সারা হাত মাখিয়ে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খায়, হয়তো সুরুত সুরুত করে প্লেট থেকে ডালও খায়। এগুলি ওর নিজের জীবনের ব্যাপার।

এখন মাশরাফি আওয়ামী লীগ করবে নাকি বিএনপি করবে সেটা কি আপনাকে জিজ্ঞাসা করে করতে হবে? সে যদি আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করতে চায়, সেটা ওর ইচ্ছা আপনার কি? আপনার যদি ইচ্ছা হয় ওর পক্ষে দুইটা কথা বলবেন বা ওর এলাকার ভোটার হলে ওকে একটা ভোট দিবেন। পছন্দ না হলে ভোট দিবেন না। ব্যাস। এর বেশী আর কি করার অধিকার আছে আপনার? বাংলাদেশের জাতীয় দলের খেলোয়াড় বলে কি সে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ দলের ক্যাপ্টেন হিসাবে ওর তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা আছে। সেই জনপ্রিয়তা সে নিজের লাভের জন্যেও ব্যাবহার করে। সেটাও তো অবৈধ কিছু না। কাল যদি টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখেন যে মাশারাফি একটা মশা মারার স্প্রে হাতে নিয়ে বলছে যে , আসুক মশা ধরে দিবানি, আপনারা কি ওর নিন্দা করবেন? কেন করবেন? মানুষের পার্সোনাল এট্রিবিউট তো মানুষ নানারকমভাবে ব্যাবহার করে। পরশু যদি মাশ্রাফি একটা পাঞ্জাবীর দোকান খুলে বসে, কিছু মানুষ তো যাবে, যাই মাশরাফি ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবী কিনে নিয়ে আসি। এগুলি সবই বৈধ।

আর জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা তো এর আগেও ইলেকশন করেছে, নমিনেশন চেয়েছে, দলের পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। বাদল রায়ের কথা মনে নাই? আমাদের এই সংসদেও তো ফুটবলাররা এমপি আছেন। ক্রিকেটারও ইলেকশন করেছিল, আমাদের সাবেক ক্যাপ্টেন একজন, পাশ করেছিল কিনা ভুলে গেছি। মাশরাফির বেলায় এতো কুরকুরানি উঠে গেল?

না, আপনি ব্যাপারটা পছন্দ নাও করতে পারেন। আপনার মনে হতে পারে যে আওয়ামী লীগ একটি মন্দ দল, মাশরাফি কেন এই মন্দ দলে যোগ দিবে। মনে করতে পারেন যে আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছে, মাশ্রাফি কেন স্বৈরাচারীদের দলে যোগ দিবে ইত্যাদি। এইগুলি তো হচ্ছে রাজনৈতিক মতামতের ব্যাপার। মাশারফির সাথে এইসব ইস্যুতে আমার মতের মিল নাও হতে পারে, মাশরাফির মতামত আপনার কাছে ভ্রান্তও মনে হতে পারে। তার জন্যে আপনি তাকে রাজনৈতিকভাবে সমালোচনা করতে পারে।

কিন্তু আপনি যদি বলেন যে, আওয়ামী লীগের নমিনেশন চেয়েছে বলেই মাশরাফি মন্দ হয়ে গেছে বা যদি বলেন যে সে দুই নম্বরি হয়ে গেছে বা যদি বলেন যে তার দিকে ছুড়ে দিলাম এক রাশ ঘৃণা- এইটা তো ভাই মন্দ কথা। একজন লোক আওয়ামী লীগ করলেই আপনি ঘৃণা করবেন এটা কিরকম কথা? আমার মা সারা জীবন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে- তাঁকেও আপনি ঘৃণা করবেন? বাংলাদেশে একশজন মানুষের মধ্যে অন্তত তিরিশজন যে কোন অবস্থায় যে কোন পরিস্থিতিতে নৌকায় ভোট দেয়। এদেরকে আপনি ঘৃণা করবেন? এটা কিরকম কথা হলো?

ইমতিয়াজ মাহমুদ
আইনজীবী

Write A Comment

error: Content is protected !!