ঘটনা ১৯৯২ সালের বইমেলা। সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের একটা স্টল ছিলো। আড্ডা ছিলো আজকের অনেক বিখ্যাত লোকদের। বয়রাতলা না কয়রা তলায় জানি। হঠাৎ এক বিকেলে এক দল টুপিধারী লোক মিছিল বের করলো তসলিমা নাসরিনের বইসব মেলা থেকে সরাতে হবে। আমি ফজলুর রহমান, আনিস আলমগীরসহ অনেকেই বিস্মিত এই ভেবে যে, এরা বাংলা একাডেমির বই মেলাতে ঢুকে পড়লো? বিষয়টা সহ্য হলো না। রক্ত গরম। আবেগ বেশি। আমরা তিনজনেই মিছিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি ও আনিস ভাই এক হুংকার দিলাম-ধর শালার জামাতিদের। ব্যাস, মাত্র তিন চারজনের ধাওয়া খেয়ে ওদের সেইরকম দৌড়। ব্যানারটা আমাদের হাতে ছিলো। পুড়িয়ে ফেলতে চাইলাম। আসলাম সানি কোনোমতে পোড়াতে দিলেন না। ওরা সব ভাগলো। বিজয়ীর তৃপ্তি নিয়ে আমরা আবার আড্ডায়।

তসলিমা নাসরীন

বেশ হাসাহাসি করলাম, শালাদের দাবড়ানি দিতে পেরে। তো আড্ডা ঘোরা ফেরা শেষে। স্টল গোটানোর সময় এসে পড়লো। রাত তখন কটা? সাতটা কী আটটা। হঠাৎ দেখি একদল সশস্ত্র যুবক আসছে আমাদের দিকে। ফজলু বেশ দূরে, আনিস আলমগীর লম্বা হওয়াতে তাকেই ওরা প্রথমে জিজ্ঞেস করলো, মিছিলে হামলা চালিয়েছে কে? তার উত্তর দেয়ার আগে বেকুব সাহসী আমি ভাবলাম এরা যদি শিবির হয় এত সাহস পায় কই? আমি এগিয়েে গিয়ে বললাম, আমি চালিয়েছি। কী করবি করতো দেখি? বলা শেষ হওয়া মাত্র আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা। হঠাৎ কোথা থেকে কবি নুরুল হুদা ও ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক ইস্তেকবাল হোসেন এসে, একজন পেছনে একজন সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে ব্যারিকেডের মত ঘিরে রাখলো। এবং ওরা আমাকে আর স্পর্শ করতে না পারলেও ক্রমাগত কিল ঘুষি লাথি মারা প্রয়াস চলছে। অনেক কষ্টে হুদা ভাই ও ইস্তেকবাল ভাই ওদের ফেরালো। দুজনেই কিন্তু আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ওরা মারাত্মক অস্ত্র বের করে ফেললো। এর মধ্যে পুলিশ চলে এলো। আমাকে গার্ড দিয়ে একাডেমির ডিজির রুমে নেয়া হলো। ভেতরে গিয়ে দেখি মহারানী তসলিমা নাসরিন মুচকি হাসছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,ও আপনি নাকি? এরপর পুলিশ প্রহরায় মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলাম।

পুনশ্চঃ অনেক পরে শুনলাম আমিনী সাহেবকে টাকা দিয়ে বেগম তসলিমা নাসরিন পুরান ঢাকার মাদ্রাসা থেকে এই ছেলেগুলো ভাড়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিবির দিয়ে মিছিল করিয়েছেন বিতর্কিত হতে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বন্ধুর রুমে আমি মাঝে মাঝে রাত কাটাতাম আমার সেই বিখ্যাত বন্ধু জাসদ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তাকে বোঝানো হয়েছে মেলায় ছাত্রলীগ হামলা করেছে তাদের উপর। তাই অস্ত্র দরকার। তিনিও দিয়ে দিলেন তার অজান্তে বন্ধু হত্যার মিশনে। সেই বন্ধু বিখ্যাত সাংবাদিক মীর মাসরুর জামান রনি।

রোকন রহমান
সাব এডিটর
চ্যানেল আই অনলাইন

এর পরে সাংবাদিক আলতাফ পারভেজ Altaf Parvez আমার কাছে কলকাতার সুকুমারী ভট্টাচার্যের একটি বই আনেন যেটার হবহু নকল ছিলো তসলিমার নির্বাচিত কলাম বইটি। আমরা তমলিমার সাক্ষাৎকার নেয়ার একটা উদ্যোগ নিলাম এই বিষয়টা নিয়ে। ওনার মালিবাগের বাসায় গেলাম। আলতাফ ভাই বিনয়ী ভদ্র ভাষায় তাকে বললেন। তিনি আমাদেরকে দাঁড়িয়ে রেখে জিজ্ঞেস করলেন,বিষয় কী?আলতাফ একটু কৌশলী হয়ে শুধু সুকুমারীর নামটা বলে দিলেন। উনি মুখটা গম্ভীর করে বললেন, আমি এখন ব্যস্ত। পরে আসুন। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দরোজার দিকে এগিয়ে এলেন। মানে চলে যান। অগত্যা চলে আসি।সেই সাক্ষাতকার আর নেইনি।

বাংলাদেশের জাতীয় লেখককূলের বিখ্যাত হওয়ার নানাবিধ কৌশল আর উদগ্র বাসনার আরো গল্প আছে। আমিতো যে কেবল দর্শক ছিলাম।

Write A Comment

error: Content is protected !!