স্থাপত্য বলতে কেবল একটি ভবনকে বোঝায় না, শিল্পকেও বোঝায়। কিন্তু সব স্থাপত্য শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে যেমন অনেক কিছু বোঝানো যায়, তেমনি স্থাপত্যেরও কিছু বিশেষ দিক রয়েছে। এটা হলো ব্যবহারিক শিল্প। সংসদ ভবন এসবের মাত্রা অতিক্রম করেছে। এটিকে আমরা স্কাল্পচার বলতে পারি, কবিতা বলতে পারি এমনকি অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংও বলতে পারি।

অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং বলছি, কারণ আমরা যে রিয়েলিস্টিক পেইন্টিং করি, তা অনেকটা ভেঙে ভেঙে গদ্যের মতোই করি। সেখানে বলে দেয়া থাকে এটা গাছ, এটা নদী, এটা নালা ইত্যাদি। কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ে বিমূর্ততা আছে। বিমূর্ততা হলো এমন জিনিস, যেখানে একেকজন দর্শক ছবিটি দেখে নিজের মতোই অনুধাবন করে। সেই অর্থে সংসদ ভবন শিল্পমান অর্জন করেছে।

জাতীয় সংসদ ভবন

আমাদের স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বা ঐতিহ্য কিন্তু খুব প্রাচীন নয়। আমরা কিন্তু নগর-সভ্যতায় অভ্যস্ত জাতি নই। আমরা কৃষক জাতি। মাটির ঘর, বেড়ার ঘর এগুলোই আমাদের ছিল। আমাদের স্থাপত্যের আধুনিক ধারার মূল সূত্রপাত হয়েছে সংসদ ভবন থেকে। লুই আই কান একজন বিদেশি স্থপতি হয়েও আমাদের জলবায়ু, আমাদের ম্যাটেরিয়ালকে কনসিডার করেছেন। তিনি আমাদের এ আবহাওয়ার জন্য অত্যন্ত নতুন, রেজিলিয়ান, ডিউরেবল ও সাসটেইনেবল ম্যাটেরিয়াল উপহার দিয়ে গেছেন, যা আমরা এখন ব্যবহার করছি।

কংক্রিটের সংসদ ভবন আমাদের নতুন স্থাপত্যের সূচনা। পুনঃসূচনাও বলা যেতে পারে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের তো আসলে সেরকমভাবে নগর স্থাপত্য ছিল না। এখান থেকেই সূচনা বা পুনঃসূচনা হয়েছে। দুই কিংবদন্তী স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং স্থপতি লুই আই কানের মাধ্যমেই আমাদের আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা বা সূত্রপাত হয়েছে।

লুই কানের প্রস্তুতকৃত প্রাথমিক মডেল

আমরা ছিলাম কৃষক জনগোষ্ঠী। আর ধনাঢ্য জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু। হিন্দুদের যে জমিদার বাড়ি ছিল সেগুলোর নকশা তারা বাইরে থেকে করে নিয়ে আসত। এরপর আমরা যখন বড়লোক হলাম তখন বিপদটা ঘটল। আশির দশকে এসে আমরা বিপদটা অনুভব করলাম। তখন নব্য বড়লোকেরা সংসদ ভবনকে পাশ কাটিয়ে নতুন ধারা তৈরি করার চেষ্টা করল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইল। বড়লোকরা ভাবত আমিও জমিদারদের মতো একটা বাড়ি বানাব, যেখানে আমার গ্রামের লোকেরা এসে স্যান্ডেল খুলে ভেতরে প্রবেশ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নব্বইয়ের দিকে এসে এ ধারা উবে যেতে থাকল। আবার সেই পিওরিটিতে আমরা ফিরে আসতে থাকলাম। পিওরিটি বলতে বোঝাচ্ছি কসমেটিক ছাড়া। যেমন সংসদ ভবনে কোনো কসমেটিকের কাজ নেই। অর্থাৎ ওটা যে ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি, সেটারই প্রতিফলন দিচ্ছে।

আমরা অনেকেই মনে করি আমাদের স্থাপত্যের মূল উৎস কী হবে। এটা নিয়ে অনেক দ্বন্দ্ব আছে। আমার মতে, আমাদের স্থাপত্যের উৎস হচ্ছে স্বচ্ছতা। আমি মানবিক অর্থে স্বচ্ছতার কথা বলছি, কাচের স্বচ্ছতা না। অর্থাৎ আমি যা, তা-ই। আমরা নব্য বড়লোকের কথা বলতে পারি। যেমন সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরের নব্য বড়লোকেরা ছিল মূলত জেলে-গোষ্ঠী। চায়নার নিন্মবর্ণের চাইনিজরা একসময় সিঙ্গাপুরে থাকত। এরপর মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুর থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন সিঙ্গাপুরের ওই চাইনিজরা টাই পরে ফিটফাট বাবু হয়ে গেল। আবার মালয়েশিয়াতে গেলে আপনি অরিজিনাল কিছু চাইনিজের দেখা পাবেন। তারা কিন্তু টি-শার্ট পরেই দিব্যি অফিস করছে। যারা মাটির থেকে তৈরি হয়, তারা কিন্তু ওইসব বেশভূষা প্রাধান্য দেয় না। বেশভূষা তারাই প্রাধান্য দেয়, যারা মেকি।

লুই আই কানকে মাস্টারপ্ল্যানের জন্য দেয়া হয়েছিল ২০০ একর জমি। কিন্তু তিনি কাজ করেছিলেন ৬০০ একর জমির ওপর। দক্ষিণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও উত্তরে ক্রিসেন্ট রোডের মাঝখানে ২০০ একর জায়গায় আমাদের সংসদ ভবন।

নিবিড়ভাবে সংসদ ভবনের নকশা পর্যবেক্ষণ করছেন স্থপতি লুই কান

আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন গেল বিশ শতকের নির্বাচিত ১০০টি স্থাপত্যের একটি। ১৯৬২ থেকে ১৯৮১ লেগেছে এই পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। স্থপতি লুই কান মারা যান চুয়াত্তরে। কিন্তু এর আগেই ১৯৭৩ সালে ভবনের ধারণাটি চূড়ান্ত করে দিয়ে যান।

সংসদ ভবন, সংসদ সদস্যদের আবাসিক ভবন, দক্ষিণ দিকের খোলা অংশ জনগণের জন্য—এটাই হচ্ছে পুরো পরিকল্পনার ধারণা। এই দক্ষিণ প্লাজা বা চত্বর দীর্ঘদিন জনগণেরই থেকেছে। এই চত্বরে হেঁটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই রয়েছে। যতদূর মনে পড়ে, দেড় দশক আগেও সংসদ ভবনের দক্ষিন দিকটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সামরিক একনায়করাও একে অবরুদ্ধ করেনি। স্মৃতি যদি বেঈমানি না করে তবে দুটি কারণ দেখানো হয়েছিল অবরুদ্ধ করবার পেছনে, একঃ দক্ষিন প্লাজা প্রতিনিয়ত নোংরা করে ফেলা হয় যা পরিচ্ছন্ন রাখা বেশ ব্যায়সাপেক্ষ এবং দুইঃ জাতীয় সংসদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সে যাই হোক, রাষ্ট্রের অনেক কিছুই জনগণের নেই। জাতীয় সংসদের মতো অসামান্য একটি স্থাপত্য দর্শনের সাথে সাথে কিছুটা বিনোদনের সুযোগও অবারিত ছিল প্রায় ৩ দশক। সাধারণের অধিকার থাকুক আর নাই থাকুক, সংসদ ভবন আছে ও থাকবে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে।

(কৃতজ্ঞতাঃ স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ)

Write A Comment

error: Content is protected !!